রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

তাইওয়ান ইস্যুতে সতর্ক বার্তা ট্রাম্পের, চীনের সঙ্গে উত্তেজনা এড়াতে চায় ওয়াশিংটন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানকে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সতর্ক বার্তা দিয়েছেন। বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কাউকে স্বাধীন করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কাজ করছে না এবং ওয়াশিংটন বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখতেই আগ্রহী।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য তাইওয়ান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের “স্ট্যাটাস কো” নীতির পুনরাবৃত্তি হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক বেশি। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বেড়েছে। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের কথাও বহুবার জানিয়েছে।

ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি চান চীন ও তাইওয়ান উভয় পক্ষ শান্ত থাকুক। তিনি স্পষ্ট করেন, এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী নয়, যেখানে তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর ভর করে স্বাধীনতা ঘোষণা করার পথে এগিয়ে যাবে।

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে এর আগেই বলেছেন, তাইওয়ান নিজেদের একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেই দেখে এবং আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার প্রয়োজন নেই। তবে বেইজিং তাকে “বিচ্ছিন্নতাবাদী” ও “সমস্যা সৃষ্টিকারী” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

চীন দীর্ঘদিন ধরে “এক চীন নীতি” অনুসরণের ওপর জোর দিয়ে আসছে। এই নীতির আওতায় বেইজিং দাবি করে, বিশ্বে চীনের একটিই বৈধ সরকার রয়েছে এবং তাইওয়ান তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও দ্বীপটির সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক এবং সামরিক সহযোগিতা রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন গত বছরের শেষ দিকে তাইওয়ানের কাছে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। এতে উন্নত রকেট ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত ছিল। বেইজিং এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে এবং এটিকে চীনের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করে।

তবে ট্রাম্প এখন জানিয়েছেন, অস্ত্র বিক্রির সেই চুক্তি চূড়ান্ত হবে কি না, তা তিনি পরে সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে সি জিনপিংয়ের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে ওয়াশিংটন বর্তমানে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একসঙ্গে বহু সংকট মোকাবিলার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে সরাসরি সামরিক উত্তেজনা বাড়াতে অনাগ্রহী।

অন্যদিকে বেইজিং তাইওয়ান প্রশ্নকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু হিসেবে দেখছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, বৈঠকে সি জিনপিং ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান প্রশ্ন সঠিকভাবে সামলানো না হলে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাতও সৃষ্টি হতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ান ঘিরে চীনের সামরিক মহড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুদ্ধবিমান ও নৌবাহিনীর টহল বৃদ্ধির কারণে পুরো অঞ্চলেই উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে ওয়াশিংটনের “কৌশলগত অস্পষ্টতা” নীতিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তাইওয়ানের অধিকাংশ জনগণ বর্তমানে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা কিংবা চীনের সঙ্গে একীভূত হওয়া—দুই পথের কোনোটিকেই সমর্থন করে না বলে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে। বরং তারা বিদ্যমান পরিস্থিতি বজায় রাখার পক্ষেই বেশি ঝুঁকছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য মূলত বেইজিংকে আশ্বস্ত করার একটি কূটনৈতিক বার্তা। একইসঙ্গে এটি তাইওয়ানকেও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা সহযোগী হলেও স্বাধীনতার প্রশ্নে প্রকাশ্য সমর্থন দিতে প্রস্তুত নয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন