শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

পশ্চিম তীরে ‘তৃতীয় নাকবা’: উচ্ছেদ, ভয় ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেদুইন জনগোষ্ঠীর জীবনে উচ্ছেদ যেন এক অবিরাম বাস্তবতা। ১৯৪৮ সালের নাকবার পর থেকে বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়া পরিবারগুলো এখন নতুন করে আরেক দফা সংকটের মুখোমুখি। ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীর হামলা, জমি দখল, গবাদিপশু লুট এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে বহু বেদুইন পরিবার আবারও ঘরছাড়া হচ্ছে। এই চলমান পরিস্থিতিকেই অনেক ফিলিস্তিনি এখন “তৃতীয় নাকবা” বলে অভিহিত করছেন।

পশ্চিম তীরের রাম্মুন এলাকার উপকণ্ঠে অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাসরত বেদুইন নেতা আবু নাজ্জেহ সম্প্রতি তার সম্প্রদায়ের সপ্তম উচ্ছেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়, ১৯৪৮ সালের নাকবা, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ এবং ২০২৩ সালের পর শুরু হওয়া নতুন দমন-পীড়ন—সব মিলিয়ে ফিলিস্তিনি বেদুইনদের জীবন এক দীর্ঘ মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে।

আবু নাজ্জেহর পরিবারের ইতিহাস মূলত ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুতির দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। ১৯৪৮ সালের আগে তারা নাকাব মরুভূমির বির আল-সাবা অঞ্চলে স্বাধীনভাবে বসবাস করত। পশুপালন ছিল তাদের জীবিকার মূল ভিত্তি। কিন্তু ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় সশস্ত্র জায়নবাদী বাহিনীর অভিযানে তাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। পরে তারা পশ্চিম তীরে আশ্রয় নেয়। তবে সেখানেও শান্তি মেলেনি। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখলের পর আবারও তাদের উচ্ছেদ করা হয়।

দীর্ঘ ঘুরে বেড়ানোর পর আশির দশকে রামাল্লার পূর্বদিকে আইন সামিয়া এলাকায় তারা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সেখানে কয়েক দশক ধরে তাদের পশুপালন, পরিবার ও সামাজিক জীবন গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকে ওই এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে হামলা, ভয়ভীতি, পানি ব্যবহারে বাধা, রাস্তা অবরোধ ও পশু চুরির ঘটনা বাড়ে। ফলে তাদের জীবনযাপন ক্রমেই অসম্ভব হয়ে ওঠে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বসতি স্থাপনকারীরা শুধু জমি দখলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং ফিলিস্তিনিদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার জন্য ধারাবাহিকভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। পশু বিষপ্রয়োগ, গবাদিপশু লুট, অস্ত্রধারী হামলা এবং বসতিতে অনুপ্রবেশের কারণে বহু পরিবার তাদের পশু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। একসময় যেখানে হাজার হাজার ভেড়া ছিল, এখন অনেক পরিবারের হাতে কয়েকশর কম পশু অবশিষ্ট আছে।

২০২৩ সালের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হলে পশ্চিম তীরেও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়ে যায়। ফিলিস্তিনি সূত্রগুলোর দাবি, এই সময়কে কেন্দ্র করে বহু বেদুইন গ্রাম পুরোপুরি খালি হয়ে গেছে। অনেক পরিবার এমন এলাকাতেও আশ্রয় নিতে পারেনি, যেগুলো ফিলিস্তিনি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে তুলনামূলক নিরাপদ বিবেচিত হতো।

সম্প্রতি জিলজিলিয়া এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ১৬ বছর বয়সী ইউসুফ কা’বনেহ নিহত হওয়ার ঘটনাও নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। তার পরিবারও পূর্বে আরেকটি এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীরা বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গ্রামে ঢুকে গুলি চালায় এবং গবাদিপশু লুট করে নিয়ে যায়।

মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত পশ্চিম তীরের শতাধিক সম্প্রদায়ের প্রায় ছয় হাজার মানুষ আংশিক বা পুরোপুরি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর মধ্যে বহু গ্রাম পুরোপুরি জনশূন্য হয়ে গেছে। একই সময়ে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম তীরে যা ঘটছে তা বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; বরং ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে জমি থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ। বিশেষ করে বেদুইন সম্প্রদায়গুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ তাদের জীবন ও জীবিকা উন্মুক্ত জমি, চারণভূমি ও পানির উৎসের ওপর নির্ভরশীল।

আবু নাজ্জেহর মতো অনেকেই এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। তারা বলছেন, যেখানে যাচ্ছেন, সেখানেই নতুন বসতি স্থাপনকারী ঘাঁটি গড়ে উঠছে। ফলে নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। ভয়, উচ্ছেদ এবং টিকে থাকার এই সংগ্রাম এখন পশ্চিম তীরের বহু ফিলিস্তিনি পরিবারের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন