পশ্চিম তীরে ‘তৃতীয় নাকবা’: উচ্ছেদ, ভয় ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই
- প্রান্তকাল ডেস্ক
- ২ মিনিট আগে
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেদুইন জনগোষ্ঠীর জীবনে উচ্ছেদ যেন এক অবিরাম বাস্তবতা। ১৯৪৮ সালের নাকবার পর থেকে বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়া পরিবারগুলো এখন নতুন করে আরেক দফা সংকটের মুখোমুখি। ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীর হামলা, জমি দখল, গবাদিপশু লুট এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে বহু বেদুইন পরিবার আবারও ঘরছাড়া হচ্ছে। এই চলমান পরিস্থিতিকেই অনেক ফিলিস্তিনি এখন “তৃতীয় নাকবা” বলে অভিহিত করছেন।
পশ্চিম তীরের রাম্মুন এলাকার উপকণ্ঠে অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাসরত বেদুইন নেতা আবু নাজ্জেহ সম্প্রতি তার সম্প্রদায়ের সপ্তম উচ্ছেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়, ১৯৪৮ সালের নাকবা, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ এবং ২০২৩ সালের পর শুরু হওয়া নতুন দমন-পীড়ন—সব মিলিয়ে ফিলিস্তিনি বেদুইনদের জীবন এক দীর্ঘ মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে।
আবু নাজ্জেহর পরিবারের ইতিহাস মূলত ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুতির দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। ১৯৪৮ সালের আগে তারা নাকাব মরুভূমির বির আল-সাবা অঞ্চলে স্বাধীনভাবে বসবাস করত। পশুপালন ছিল তাদের জীবিকার মূল ভিত্তি। কিন্তু ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় সশস্ত্র জায়নবাদী বাহিনীর অভিযানে তাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। পরে তারা পশ্চিম তীরে আশ্রয় নেয়। তবে সেখানেও শান্তি মেলেনি। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখলের পর আবারও তাদের উচ্ছেদ করা হয়।
দীর্ঘ ঘুরে বেড়ানোর পর আশির দশকে রামাল্লার পূর্বদিকে আইন সামিয়া এলাকায় তারা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সেখানে কয়েক দশক ধরে তাদের পশুপালন, পরিবার ও সামাজিক জীবন গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকে ওই এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে হামলা, ভয়ভীতি, পানি ব্যবহারে বাধা, রাস্তা অবরোধ ও পশু চুরির ঘটনা বাড়ে। ফলে তাদের জীবনযাপন ক্রমেই অসম্ভব হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বসতি স্থাপনকারীরা শুধু জমি দখলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং ফিলিস্তিনিদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার জন্য ধারাবাহিকভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। পশু বিষপ্রয়োগ, গবাদিপশু লুট, অস্ত্রধারী হামলা এবং বসতিতে অনুপ্রবেশের কারণে বহু পরিবার তাদের পশু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। একসময় যেখানে হাজার হাজার ভেড়া ছিল, এখন অনেক পরিবারের হাতে কয়েকশর কম পশু অবশিষ্ট আছে।
২০২৩ সালের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হলে পশ্চিম তীরেও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়ে যায়। ফিলিস্তিনি সূত্রগুলোর দাবি, এই সময়কে কেন্দ্র করে বহু বেদুইন গ্রাম পুরোপুরি খালি হয়ে গেছে। অনেক পরিবার এমন এলাকাতেও আশ্রয় নিতে পারেনি, যেগুলো ফিলিস্তিনি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে তুলনামূলক নিরাপদ বিবেচিত হতো।
সম্প্রতি জিলজিলিয়া এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ১৬ বছর বয়সী ইউসুফ কা’বনেহ নিহত হওয়ার ঘটনাও নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। তার পরিবারও পূর্বে আরেকটি এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীরা বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গ্রামে ঢুকে গুলি চালায় এবং গবাদিপশু লুট করে নিয়ে যায়।
মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত পশ্চিম তীরের শতাধিক সম্প্রদায়ের প্রায় ছয় হাজার মানুষ আংশিক বা পুরোপুরি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর মধ্যে বহু গ্রাম পুরোপুরি জনশূন্য হয়ে গেছে। একই সময়ে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম তীরে যা ঘটছে তা বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; বরং ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে জমি থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ। বিশেষ করে বেদুইন সম্প্রদায়গুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ তাদের জীবন ও জীবিকা উন্মুক্ত জমি, চারণভূমি ও পানির উৎসের ওপর নির্ভরশীল।
আবু নাজ্জেহর মতো অনেকেই এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। তারা বলছেন, যেখানে যাচ্ছেন, সেখানেই নতুন বসতি স্থাপনকারী ঘাঁটি গড়ে উঠছে। ফলে নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। ভয়, উচ্ছেদ এবং টিকে থাকার এই সংগ্রাম এখন পশ্চিম তীরের বহু ফিলিস্তিনি পরিবারের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিভাগের আরও খবর
ঢাকার যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে প্রধানমন্ত্রীর সভা
রাজধানী ঢাকা-র যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন…
বেইজিং বৈঠক ‘অত্যন্ত ইতিবাচক’: শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে…
ঈদুল আজহায় দেশে কুরবানির পশুর সংকট নেই, স্থানীয় খামারিরাই চাহিদা পূরণে সক্ষম: কৃষিমন্ত্রী
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশে কুরবানির…
উৎপাদন ব্যয় ও বৈশ্বিক চাপের মুখে তিন বছরে বন্ধ ৪০০ পোশাক কারখানা
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদহার ও…
পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশ্যে পশু জবাইয়ে কড়াকড়ি, নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন,…
সর্বশেষ খবর
জনপ্রিয় বিভাগ সমূহ
আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্র-চীন বৈঠকে নতুন ইস্যু ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালী ঘিরে কূটনৈতিক টানাপোড়েন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে ইরান যুদ্ধ ও…
ভূমধ্যসাগরের হৃদয়ে ইউরোপের ক্ষুদ্র কিন্তু সমৃদ্ধ রাষ্ট্র মাল্টা
Malta ইউরোপের একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপরাষ্ট্র। ভূমধ্যসাগরের কেন্দ্রে অবস্থিত এই দেশটি ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, পর্যটন, সামুদ্রিক বাণিজ্য, শিক্ষা…
ইলন মাস্কের এক্সএআই ডেটা সেন্টারে আরও ১৯ গ্যাস টারবাইন, পরিবেশ দূষণ নিয়ে নতুন বিতর্ক
xAI তাদের মিসিসিপির সাউথহেভেনে অবস্থিত এআই ডেটা সেন্টারে আরও ১৯টি প্রাকৃতিক গ্যাসচালিত টারবাইন যুক্ত করেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির ওই স্থাপনায়…
৩৪ হাজার কোটি টাকার ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প অনুমোদন, উপকৃত হবে ৭ কোটি মানুষ
দেশের প্রধান নদী ব্যবস্থার প্রবাহ পুনরুদ্ধার, লবণাক্ততার আগ্রাসন কমানো, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সরকার ৩৪ হাজার ৪৯৭…
কানাডায় ওষুধ রফতানি শুরু করল নেভিয়ান লাইফ সায়েন্স
বাংলাদেশ থেকে কানাডায় ওষুধ রফতানির নতুন মাইলফলক অর্জন করেছে Navian Life Science PLC (সাবেক নোভার্টিস বাংলাদেশ লিমিটেড)। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বহুজাতিক জেনেরিক…
জনবান্ধব পুলিশ গঠনের প্রত্যয়ে শেষ হলো পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬
“আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ” প্রতিপাদ্যে চার দিনব্যাপী পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ সফলভাবে শেষ হয়েছে। আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনবান্ধব…
বগুড়ায় নাজমুল হত্যা মামলায় একজন গ্রেফতার: সিআইডি
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার হাতিভাঙ্গা এলাকায় সংঘটিত নাজমুল হত্যা মামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এক সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করেছে Criminal Investigation Department।…
বসুন্ধরা সিটিতে ৯৪ কোটি টাকার স্বর্ণ আত্মসাৎ: সাবেক সেলসম্যান গ্রেফতার
রাজধানীর Bashundhara City Shopping Complex-এ অবস্থিত একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৯৪ কোটি টাকার স্বর্ণ আত্মসাতের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের সাবেক এক…

