বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

৩৪ হাজার কোটি টাকার ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প অনুমোদন, উপকৃত হবে ৭ কোটি মানুষ

দেশের প্রধান নদী ব্যবস্থার প্রবাহ পুনরুদ্ধার, লবণাক্ততার আগ্রাসন কমানো, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সরকার ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প অনুমোদন করেছে।

বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে শতভাগ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

একনেক সভা শেষে পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানী সাংবাদিকদের বলেন, “এটি জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। এর মাধ্যমে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা এবং প্রায় ৭ কোটি মানুষ উপকৃত হবে।”

পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের ১৯টি জেলা প্রকল্পের আওতায় আসবে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতীসহ প্রধান নদী ব্যবস্থার প্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার করা।

এছাড়া সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা হ্রাস, সুন্দরবনের জন্য মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, যশোরের ভবদহসহ জলাবদ্ধতা নিরসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃসঞ্চয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্প ও প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পকে সহায়তা দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম, মধ্য-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সেচ সুবিধা বাড়ানো হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যমতে, প্রকল্পটির আওতায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, দুটি ফিশ পাস, নৌ-লক, গাইড বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ বাঁধ।

এছাড়া গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর অফটেক স্ট্রাকচার নির্মাণ, গড়াই-মধুমতি নদী ব্যবস্থার ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ড্রেজিং, হিসনা নদী ব্যবস্থার ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার ড্রেনেজ চ্যানেল পুনঃখনন এবং ১৮০ কিলোমিটার অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

প্রকল্পের আওতায় মোট ১১৩ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় জিডিপিতে শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ অবদান রাখবে এবং বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে।

একই সঙ্গে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে এবং পদ্মা নদীতে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ সম্ভব হবে।

প্রকল্পের পটভূমি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭০-এর দশকে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা-গঙ্গা নদী থেকে বিপুল পরিমাণ পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে সরিয়ে নেওয়া হয় কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য। এর ফলে বাংলাদেশ অংশে পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী শুকিয়ে যেতে শুরু করে।

পরিকল্পনা কমিশনের মতে, এর প্রভাব পড়েছে কৃষি, মৎস্য, বনজ সম্পদ, নৌপরিবহন, গৃহস্থালি পানির প্রাপ্যতা এবং সামগ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর। পাশাপাশি মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সুন্দরবন ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কমিশন বলছে, বৃহত্তর রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর ও বরিশাল অঞ্চলে টেকসই জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পদ্মা নদীকেন্দ্রিক এ প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন