রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার টেস্ট জয়—বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে যোগ হলো অনন্য এক অধ্যায়। ডারউইন টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমে প্রথমবারের মতো তাদেরই ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করল বাংলাদেশ।

জয়ের জন্য মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য পায় বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪.২ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে সেই রান তুলে নেয় সফরকারীরা। এর মধ্য দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের এটি দ্বিতীয় জয়

ম্যাচে বাংলাদেশের জয়ের ভিত গড়ে দেয় প্রথম ইনিংসের বিশাল লিড এবং দ্বিতীয় ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজের দুর্দান্ত বোলিং। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে ৬৬ রানে ৫ উইকেট নিয়ে স্বাগতিকদের ২৮৪ রানে গুটিয়ে দেন এই অফ স্পিনার। হাসান মাহমুদ নেন ৩ উইকেট।

মিরাজের ঘূর্ণিতে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস শেষ

চতুর্থ দিন সকালে ৪ উইকেটে ১৬১ রান নিয়ে ব্যাটিং শুরু করা অস্ট্রেলিয়া একসময় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের ৪২৬ রানের জবাব দিতে লড়াই করছিল। কিন্তু মিরাজের কার্যকর স্পিনে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ উইকেট হারাতে থাকে তারা।

অ্যালেক্স কেয়ারিকে ৩০ রানে ফিরিয়ে জমে ওঠা ৫৬ রানের জুটি ভাঙেন মিরাজ। এরপর বাউ ওয়েবস্টারকে দ্রুত ফেরানোর পর প্যাট কামিন্সকেও নিজের শিকারে পরিণত করেন তিনি।

কামিন্সের বিদায়ের পর এক প্রান্তে অস্ট্রেলিয়ার আশা হয়ে ছিলেন ক্যামেরন গ্রিন। ১০৯ বলে ফিফটি পূর্ণ করা এই অলরাউন্ডার পরে ১৯২ বলে টেস্ট ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি তুলে নেন। দেশের মাটিতে এটি ছিল তার প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি এবং ২০২৪ সালের পর টেস্টে প্রথম তিন অঙ্কের ইনিংস।

তবে সেঞ্চুরির পর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি গ্রিন। হাসান মাহমুদের নিচু হয়ে আসা ডেলিভারিতে বোল্ড হয়ে ২০১ বলে ১০৪ রানে থামেন তিনি।

গ্রিনকে দুবার জীবন, তবু শেষ পর্যন্ত আউট

গ্রিনের ইনিংসটি অবশ্য শুরু থেকেই ছিল ভাগ্যের সহায়তায় ভরপুর। এক পর্যায়ে বল স্টাম্পে লাগলেও তিনি আউট হননি। পরে ৯৫ রানে তাসকিন আহমেদের বলে কঠিন একটি ফিরতি ক্যাচের সুযোগও তৈরি হয়। কিন্তু অভিজ্ঞ এই পেসার ক্যাচটি তালুবন্দি করতে পারেননি।

এরপর নাথান লায়নও কয়েকটি সুযোগ থেকে বেঁচে যান। তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বোলারদের চাপ সামলাতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া।

মিচেল স্টার্কও কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। গ্রিনের সঙ্গে তার ৪৩ রানের জুটি ভাঙেন তাসকিন আহমেদ। অফ স্টাম্পের বাইরের বল খেলতে গিয়ে স্টার্কের ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে যায় লিটন দাসের গ্লাভসে। ৩৪ বলে ১৮ রান করেন স্টার্ক।

শেষ পর্যন্ত নাথান লায়নকে এলবিডব্লিউ করে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের ইতি টানেন মিরাজ। ২৭ বলে ১৫ রান করেন লায়ন। জশ হেইজেলউড শূন্য রানে অপরাজিত থাকেন।

বাংলাদেশের বোলিংয়ে মিরাজ-হাসানের দাপট

অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল বোলার মিরাজ। ৩৩.১ ওভারে ৬ মেডেনসহ ৬৬ রান দিয়ে ৫ উইকেট নেন তিনি।

হাসান মাহমুদ ১৯ ওভারে ৫৬ রান দিয়ে নেন ৩ উইকেট। তাইজুল ইসলাম পান একটি উইকেট। তাসকিন আহমেদও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে স্টার্কের প্রতিরোধ ভাঙেন।

চতুর্থ দিনের প্রথম সেশনেই মিরাজ তিনটি উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেন। লাঞ্চের সময় অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ছিল ৭ উইকেটে ২৪৩ রান। তখনও গ্রিন ও স্টার্কের জুটি বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের লিডের নিচে ছিল।

এরপর নতুন বল নেওয়ার পর বাংলাদেশের পেসাররা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। তাসকিনের বলে স্টার্কের বিদায় এবং হাসানের বলে গ্রিনের বোল্ড হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার লড়াই কার্যত শেষ হয়ে যায়।

বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের বড় লিড

এর আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস শেষ হয়েছিল মাত্র ১৯৮ রানে। জবাবে বাংলাদেশ ব্যাটিং করে ৪২৬ রান, ফলে প্রথম ইনিংসে ২২৮ রানের বিশাল লিড পায় সফরকারীরা।

সেই লিডই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে এনে দেয়। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানের বেশি করতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।

১৪.২ ওভারে ইতিহাস

ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ শুরুতেই হারায় তানজিদ হাসানকে। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তানজিদ দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র শূন্য রানে জশ হেইজেলউডের বলে বোল্ড হন।

তবে এরপর আর কোনো বিপদ হতে দেননি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হকের ব্যাটে দ্রুত এগিয়ে যায় দল। শেষ পর্যন্ত ১৪.২ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে ৫৭ রান তুলে নেয় বাংলাদেশ।

এর মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয় নিশ্চিত হয়।

ম্যাচের সংক্ষিপ্ত স্কোর

অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস: ১৯৮

বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ৪২৬

অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংস: ২৮৪
ক্যামেরন গ্রিন ১০৪, অ্যালেক্স কেয়ারি ৩০, মিচেল স্টার্ক ১৮, নাথান লায়ন ১৫

বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস: ৫৭/১, ১৪.২ ওভার

ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী।

বাংলাদেশের সেরা বোলার: মেহেদী হাসান মিরাজ ৩৩.১-৬-৬৬-৫; হাসান মাহমুদ ১৯-৩-৫৬-৩।

এই জয় শুধু একটি টেস্ট ম্যাচের ফল নয়; অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটানো এক ঐতিহাসিক অর্জন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন