অনুসরণ করুন:
রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

বিদ্যুৎ সংকট: প্রধানমন্ত্রীর ছয় মাসের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে ৪ প্রস্তাব হাসনাতের


দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে ছয় মাসের সময়সীমা দিয়ে যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, তা গ্রহণ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় চারটি প্রস্তাব দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।

শনিবার (১৫ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে দেওয়া প্রস্তাবগুলো প্রধানমন্ত্রীকে পড়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান নিয়ে বিরোধী দলের কাছে ইতিমধ্যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। সংসদীয় কমিটির আহ্বায়ক ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ১৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে সরকার এখন পর্যন্ত এসব প্রস্তাব আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা প্রদানের জন্য ছয় মাসের আলটিমেটাম দিয়ে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন। আমরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম এবং সমাধান পরিকল্পনা প্রস্তাব করছি।”

১৫ দফা প্রস্তাবের কথা তুলে ধরলেন হাসনাত

হাসনাতের ভাষ্য অনুযায়ী, নাহিদ ইসলামের প্রস্তাবে ৩০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য পাঁচটি, ৬ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য ছয়টি এবং দীর্ঘমেয়াদি চারটি পদক্ষেপ রয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকটের পেছনে ভর্তুকি নীতি, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান এবং ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যানের ঘাটতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

হাসনাত বলেন, নাগরিক সমাজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকেও এ বিষয়ে বিভিন্ন মতামত এসেছে, যা জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এবং বিভিন্ন সেমিনারে আলোচিত হয়েছে।

এনসিপির এই নেতা অভিযোগ করেন, সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীসহ বড় আকারের টিম থাকা সত্ত্বেও এসব তথ্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছায়নি। তাঁর ভাষায়, বিষয়টি সরকারের নীতিগত অবস্থানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট টিমের কার্যকারিতা ও সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।

ফুয়েল ও কন্টিনজেন্সি প্ল্যান নিয়ে প্রশ্ন

বিদ্যুৎ সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন হাসনাত। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনে ব্যাপক দলীয় পদায়নের ফলে প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ফুয়েল প্ল্যান, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান ও ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি নেই।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জায়গায় ভর্তুকি কমানো হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

মহেশখালী এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরে হাসনাত অভিযোগ করেন, ওই ঘটনার পর রক্ষণাবেক্ষণে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, সে বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ঘটনাটি নাশকতা নাকি অবহেলার কারণে ঘটেছে, সে বিষয়েও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট নয় বলে দাবি করেন তিনি।

মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি বাস্তবায়নের দাবি

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে ডলার সংকট এবং বকেয়ার বিষয়টি সরকারের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হলেও এর বিকল্প হিসেবে ‘মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫’ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন হাসনাত আবদুল্লাহ।

তিনি বলেন, এ কাঠামোর আওতায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে। বিদ্যুতের মূল্য দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এতে অবহিত থাকবে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগও থাকবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

হাসনাতের দাবি, এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হবে না। তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাঠামো ও চুক্তির শর্ত চূড়ান্ত করে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।

বিশেষ সংসদীয় অধিবেশনের আহ্বান

বিদ্যুৎ সংকটের কারণ ও সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিশেষ সংসদীয় অধিবেশন আহ্বানের যে অনুরোধ জানানো হয়েছে, তাতেও সরকারের সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানান হাসনাত।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংসদীয় পরিসরে কার্যকর আলোচনা প্রয়োজন। সংকট সমাধানে ইতিমধ্যে দেওয়া প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

‘ছয় মাসের হিসাব আমরা মেনে নিলাম’

প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ছয় মাসের সময়সীমার প্রসঙ্গ তুলে হাসনাত বলেন, বিরোধী দল আগে থেকেই সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছে। এখন সরকার সেই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করে দেখাতে পারে।

তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বলার আগেই আমরা সমাধান দিয়েছি। আপনারা সেটা পড়ার দরকার মনে করেননি কিংবা আপনার কাছে পৌঁছানো হয়নি। তথাপি, ছয় মাসের হিসাবটা আমরা মেনে নিলাম। কিন্তু ঘড়িটা বিরোধী দলের নয়, আপনার সরকারের।”

মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি বাস্তবায়নে ছয় মাসের বেশি সময় লাগলে সেটিকে কেবল নীতিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, তখন সেটি সরকারের সক্ষমতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।

সরকারের জবাবদিহি দাবি

বিদ্যুৎ সংকটের জন্য সরকারকেই জবাবদিহি করতে হবে বলে মন্তব্য করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকার ছয় মাস দায়িত্বে থাকার পরও দেশে কেন এত ব্যাপক লোডশেডিং দেখা দিয়েছে।

হাসনাত বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারকে তার কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হয়। বিরোধী দলকে চ্যালেঞ্জ দেওয়ার পাশাপাশি সরকারের নিজেদের নেওয়া সিদ্ধান্ত ও তার ফলাফল নিয়েও জনগণের কাছে ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।

সবশেষে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের প্রস্তাব বিরোধী দলের হাতে রয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা সরকারের হাতে। ছয় মাস পর জনগণ জানতে চাইবে—দেশ অন্ধকারে থাকার কারণ সমাধানের অভাব, নাকি তা বাস্তবায়নের সক্ষমতার ঘাটতি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন