সোমবার, ৮ জুন ২০২৬

উন্নয়ন প্রকল্পে মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর, প্রয়োজন হলে সংবিধান সংশোধনের ইঙ্গিত

সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার অব্যাহত রাখা, যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বহাল রাখা এবং সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি।

শনিবার (৫ জুন) সংসদ ভবনে সরকারি দলের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের জনগণের কাছে সরকারি সেবার সুফল পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।

চিফ হুইপ বলেন, বৈঠকে শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, আইন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সাতটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, সমস্যা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

তিনি জানান, শিক্ষা খাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পাঠ্যক্রমকে আরও যুগোপযোগী ও আধুনিক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে মিড-ডে মিল কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলে তরুণদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তোলার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

স্বাস্থ্য খাতের বিষয়ে চিফ হুইপ বলেন, ডেঙ্গু ও হামসহ মৌসুমি রোগ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। হাসপাতাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নতুন হাসপাতাল নির্মাণ এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সরকার ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

তিনি আরও জানান, দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের সক্ষমতা বাড়াতে চীনের সহযোগিতায় পাঁচটি নতুন হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত একটি হাসপাতালের কাজ এগিয়ে গেছে এবং প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন যে হাসপাতালগুলোর মধ্যে কমপক্ষে একটি নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত হবে।

যোগাযোগ খাত নিয়ে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সড়ক, সেতু ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। ঢাকা-সিলেটসহ গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের উন্নয়নকাজ এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি পরিবহন টার্মিনাল, পানি উন্নয়ন এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়িত হলে কৃষি উৎপাদন ও সেচ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, অধিকাংশ গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করেই সীমিত পরিসরে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এরপরও সরকার প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করছে। তিনি দাবি করেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও ৬৬ শতাংশ গ্রাহকের ওপর এর প্রভাব পড়বে না এবং যারা ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন তাদের বিল বৃদ্ধি পাবে না।

আইন ও বিচার ব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে সরকার কাজ করছে। শিশু নির্যাতনসহ গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চিফ হুইপ বলেন, আলোচিত রামিসা হত্যা মামলা প্রধানমন্ত্রীর কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। তিনি জানান, মামলাটির বিচার দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে এবং রোববার এর রায় ঘোষণা করা হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে দেশে চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের কোনো স্থান নেই। অপরাধ ও মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর এবং কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে।

চিফ হুইপ আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ও সেবার বাস্তব অবস্থা নিয়মিত তদারকির নির্দেশ দিয়েছেন। কোথাও স্কুলে শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে, হাসপাতালে সেবা ব্যাহত হলে কিংবা সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে গাফিলতি দেখা দিলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এনে সমাধানের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু প্রকল্প গ্রহণ নয়, বরং জনগণ যেন তার বাস্তব সুফল পায় তা নিশ্চিত করা।

আসন্ন বাজেট অধিবেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের আর্থিক বাস্তবতা ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় কাজ করছে।

সংবিধান সংশোধন বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সময়ের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করা হয় এবং বাংলাদেশেও অতীতে একাধিকবার তা হয়েছে। তিনি বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ও মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সময়োপযোগী পরিবর্তনের জন্য সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিরোধী দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এগিয়ে যাওয়া উচিত। সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় সব রাজনৈতিক পক্ষ গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

মন্ত্রীদের কার্যক্রম নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মূল্যায়নের প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিয়মিতভাবে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যালোচনা করেন এবং কোথাও ত্রুটি বা দুর্বলতা থাকলে তা সংশোধনের নির্দেশ দেন। প্রশাসনকে আরও জনমুখী ও কার্যকর করে জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন