রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

সংবিধান সংশোধনে সর্বোচ্চ অর্জন চান আসিফ নজরুল

তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচনব্যবস্থা ও ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা; বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন বাদ পড়ায় হতাশা

সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির কাছ থেকে সর্বোচ্চ অর্জন আশা করছেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তিনি বলেছেন, সংবিধানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। একই সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা যেন সংশোধন প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয়, সে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

শনিবার বিকেলে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠক থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের আসিফ নজরুল বলেন, “আমরা আশা করব যে সংবিধান যে পর্যায়ে আছে এখন তার চেয়ে যেন আমরা অনেক অ্যাডভান্সড একটা সংবিধান পাই। এবং যতটুক অর্জন হবে সেটাই আমাদের লাভ। তবে আমরা চাই সর্বোচ্চ অর্জন যেন হয়।”

তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আমরা কী চেয়েছিলাম, আইনের মধ্যেই আপনারা বুঝতে পারেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সংবিধানে যেকোনো পরিবর্তনই একটা সংস্কার, যদি এটা ইতিবাচক হয়। আমি বিশ্বাস করি, শেষ পর্যন্ত আমরা লক্ষ্যটা অর্জন করতে পারছি কি না, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ; কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করলাম, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।”

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা

শনিবার সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শুরু হয়। কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইন বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।

বৈঠকে আলোচনার বিষয় তুলে ধরে আসিফ নজরুল বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে, নাকি সংবিধান সংশোধন কমিটির মাধ্যমেই কাজ এগোবে—এ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধে তিনি যেতে চান না।

তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠান যেগুলো রয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, সেগুলো নিয়ে কথা হয়েছে।”

আসিফ নজরুল জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে গঠন করা হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং আলোচনা এখনো চলছে। এ ছাড়া নির্বাচনব্যবস্থা ও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও কথা হয়েছে।

পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে পুরোনো অভিজ্ঞতার কথা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বে গঠিত সংসদীয় সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠকেও তিনি আমন্ত্রিত হয়ে মতামত দিয়েছিলেন।

সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা অনেক প্রত্যাশা নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু পরে প্রতারিত হয়েছি। পরে দেখলাম, খুবই নিন্দিত একটা সংশোধনী—পঞ্চদশ সংশোধনী—পাস হয়েছে।”

এবারের কমিটি নিয়ে আশাবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “এটা তো দ্বিতীয়বার সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আসা। আশা করি, এবার আমরা আরও ভালো পরিবর্তন পাব। গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশাটা যেন আমাদের মাথায় থাকে, সেই আবেদন করেছি।”

বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন নিয়ে হতাশা

সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ আইন এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন বাদ দেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, এ দুটি আইনের পক্ষে বিএনপির নিজস্ব অঙ্গীকারের কথাও তিনি কমিটিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

আসিফ নজরুল বলেন, “তখন মাননীয় আইনমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, এটা ওনারা আইন করবেন পরে। এটা ওনারা বাদ দিয়েছেন মানে একদম সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে দিয়েছেন, এমন না।”

অর্থাৎ, আইন দুটি সংশোধন প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়লেও পরবর্তী সময়ে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিষয়গুলো বাস্তবায়নের কথা তাকে জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের নেতৃত্বের প্রস্তাব

সংসদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থায়ী কমিটির প্রধান হিসেবে বিরোধী দলের সদস্যদের রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন আসিফ নজরুল। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো উত্তর পাননি বলে জানান।

তিনি বলেন, “আমি রিকোয়েস্ট করেছিলাম যে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা কমিটির প্রধান হিসেবে যেন বিরোধী দলের সদস্যদের রাখা হয়। তো এটার ব্যাপারে কোনো উত্তর পাইনি।”

স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, সে জন্য সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদের আওতায় আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আইন করার কথা জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন আসিফ নজরুল।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই জাতীয় সনদ গৃহীত হয়। সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে পরে জটিলতা তৈরি হয়।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ীরা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য—দুই পরিচয়েই শপথ নেন।

গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলনের মধ্যে বিএনপি সরকার সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠন করে। তবে এতে বিরোধী দল কোনো প্রতিনিধি দেয়নি।

এর আগে কমিটি রাজনৈতিক দল ও জোট, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, বিশিষ্ট নাগরিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতা, নারী নেতৃত্ব এবং গণঅভ্যুত্থানের অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। শনিবারের বৈঠকে সংবিধানে সর্বজনগ্রাহ্য সংশোধনীর খসড়া প্রণয়ন, সামগ্রিক সংস্কার এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা মতামত ও পরামর্শ দেন।

বৈঠকে আইনজীবী শাহদিন মালিক ও মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানসহ প্রায় ৪৪ জন বিশেষজ্ঞ অংশ নেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন