প্যাকেটজাত খাদ্যে বিএফএসএর নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করতে হবে, নিয়ম না মানলে দণ্ডনীয় অপরাধ; প্রথমবার ১৬ শ্রেণির ব্যবসায় নিবন্ধন বিনা মূল্যে
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং খাদ্য ব্যবসায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্যপণ্যের জন্য নিবন্ধন ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। আগামী ১ নভেম্বর থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে বিএফএসএর নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করার নির্দেশনা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় বিএফএসএ।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১৬ জুলাই ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং নতুন প্রবিধানমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবসায়িক লাইসেন্স, প্রিমিসেস লাইসেন্স, উৎপাদিত ও আমদানিকৃত পণ্যের লাইসেন্স এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত পণ্যের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
যেসব খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন লাগবে
প্রবিধানমালার তফসিলে খাদ্য ব্যবসাকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। নির্ধারিত ১৬ শ্রেণির প্রচলিত খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে নিবন্ধন নিতে হবে। এসব ব্যবসার মধ্যে রয়েছে রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ, ক্যাটারিং সেবা, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্যাকেটজাত বা মোড়কজাত খাবারের উৎপাদক।
এ ছাড়া পথের ধারের ভ্রাম্যমাণ বা অস্থায়ী খাবারের দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ এবং রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি ও পেঁয়াজুর মতো খাবার বিক্রি করেন—এমন ব্যবসায়ীদেরও নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে।
পাইকারি মুদি খাদ্য ব্যবসা, খাদ্য সংরক্ষণাগার ও কোল্ড স্টোরেজ, ভোজ্যতেল ও ভোজ্য লবণ উৎপাদন, কাঁচা ও তাজা খাদ্য আমদানি এবং খাদ্যপণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, আমদানি, রপ্তানি ও বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্ধারিত ব্যবসার ক্ষেত্রেও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যে লাগবে লাইসেন্স
প্রচলিত খাদ্য ব্যবসার পাশাপাশি বিশেষায়িত ও নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য লাইসেন্সের বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য, চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য এবং নিউট্রাসিউটিক্যালসহ অনুরূপ পণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, আমদানি ও বিপণন।
শিশুদের ফর্মুলা দুধ এবং বয়স্ক বা নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি বিশেষ ধরনের খাবারের মতো পণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বিধান অনুসারে লাইসেন্স নিতে হবে।
এ ছাড়া বংশগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত বা সংশোধিত খাদ্য, জৈব খাদ্য, কিরণ-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, স্বতাত্ত্বিকভাবে পরিবর্তিত খাদ্য, অভিনব খাদ্য, ব্যবহারিক খাদ্য ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য সহায়ক দাবি বা রোগের ঝুঁকি হ্রাসের দাবি রয়েছে—এমন খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও নিবন্ধন নিতে হবে।
আবেদন, ফি ও মেয়াদ
বিএফএসএ জানিয়েছে, প্রবিধানমালার তফসিল-১০-এ নির্ধারিত ফি পরিশোধ এবং সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণ করে আবেদন করতে হবে। বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ফরম ৬.১, ৭.১, ৮.১ ও ৯.১ এবং নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ফরম ৫.১ অনুযায়ী আবেদন জমা দিতে হবে।
নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর। মেয়াদ শেষ হলে সেগুলো নবায়ন করতে হবে। তবে প্রচলিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রথমবার নিবন্ধন বিনা মূল্যে করা হবে।
বিশেষায়িত খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রিমিসেস লাইসেন্সের ফি নির্ধারণ করা হবে প্রতিষ্ঠানের আয়তনের ভিত্তিতে। ১০০ বর্গমিটার বা তার কম আয়তনের প্রতিষ্ঠানের জন্য ফি ১০ হাজার টাকা। অন্যদিকে ১০ হাজার বর্গমিটারের বেশি আয়তনের প্রতিষ্ঠানের নতুন লাইসেন্স নিতে ৬০ হাজার টাকা দিতে হবে।
পণ্যের প্যাকেটে নিবন্ধন নম্বর বাধ্যতামূলক
নতুন বিধানের আওতাভুক্ত প্রতিটি খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে বিএফএসএর নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করতে হবে। এর মাধ্যমে ভোক্তারা পণ্যের প্যাকেট দেখেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন রয়েছে কি না, তা জানতে পারবেন। পাশাপাশি নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে পণ্য বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অভিযোগ জানানোর সুযোগও তৈরি হবে।
প্রাথমিকভাবে বিএফএসএর সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যাবে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ অনলাইনে আবেদন গ্রহণের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
নিয়ম না মানলে দণ্ডনীয় অপরাধ
বিএফএসএ সতর্ক করে জানিয়েছে, নিবন্ধন বা লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও তা ছাড়া খাদ্য ব্যবসা পরিচালনা করা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।
তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও লাইসেন্স নেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে খাদ্য ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুরোধ জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিএফএসএর মতে, নতুন এই বিধান কার্যকর হলে খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন ও লাইসেন্স কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও বিপণন আরও সুশৃঙ্খল হবে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার কার্যক্রম জোরদার হবে।

