কারাগারে ৯৫ বন্দীর মৃত্যু, হেফাজত ও নির্যাতনে প্রাণ গেছে ১২ জনের; সাংবাদিক, নারী-শিশু ও শ্রমিক নির্যাতনের চিত্রেও উদ্বেগ
২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ১ হাজার ১৩টি ঘটনায় প্রাণ গেছে ৭৩ জনের, আহত হয়েছেন ৬ হাজার ৪৭৩ জনের বেশি। এ ছাড়া কারাগারে ৯৫ বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন আরও ১২ জন।
রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাতের পাশাপাশি গণপিটুনি, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং কারাগারে মৃত্যুর এসব ঘটনা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে সংগঠনটি।
দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ, সংগঠনটির নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই পর্যবেক্ষণ তৈরি করা হয়েছে।
সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, “মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা ও গণপিটুনি, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা, হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যু এবং গুম ও জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার অভিযোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। এসব সমস্যার সমাধান না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত ১৮৭
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত নয় মাসে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক্বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৮৭ জন, আহত হয়েছেন ৪০১ জন।
রাজনৈতিক সহিংসতার ৯৩১ ঘটনায় বিএনপির সম্পৃক্ততার তথ্য
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ১ হাজার ১৩টি ঘটনায় ৭৩ জন নিহত ও ৬ হাজার ৪৭৩ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৯৩১টি ঘটনায়, অর্থাৎ প্রায় ৯১ শতাংশ ঘটনায়, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিংবা অন্য দলগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষের তথ্য উঠে এসেছে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৩৪২টি ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও ২ হাজার ৬৩২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ৩২১টি ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ২ হাজার ১৯০ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষের ৯৩টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯ জন, আহত হয়েছেন ৫৪৫ জন।
বিএনপি-এনসিপির সংঘর্ষের ৪৭টি ঘটনায় ৩২০ জন আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ-এনসিপির পাঁচটি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫৮ জন। আওয়ামী লীগ-জামায়াতের দুটি সংঘর্ষে একজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে একজন নিহত হয়েছেন।
বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১২৮টি ঘটনায় ৩২০ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে ৭৪টি সংঘর্ষে ১১ জন নিহত ও ৪০৫ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৪৬, জামায়াতের ৮ ও আওয়ামী লীগের ৬ জন রয়েছেন। এ ছাড়া একজন চরমপন্থী, একজন সাধারণ নারী এবং অন্যান্য দল বা রাজনৈতিক পরিচয় অজানা ১১ জন নিহত হয়েছেন।
আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, নির্বাচন, সমাবেশ, চাঁদাবাজি এবং প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষকে এসব সহিংসতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে এইচআরএসএস। এসব ঘটনায় বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় নিহত ১৩
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক ৪০২টি সহিংসতার ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ২ হাজার ৬২৩ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৯ জন, জামায়াতের দুজন, আওয়ামী লীগের একজন এবং রাজনৈতিক পরিচয় অজানা একজন রয়েছেন।
এ সময়ে ছয় শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর অন্তত ৮৮টি হামলায় ৫২ জন নিহত ও অন্তত ১০০ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৩০, আওয়ামী লীগের ১১, জামায়াতের ৫ ও অন্যান্য দলের ৬ জন রয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৫০ জনের বেশি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার ৫ হাজার ৬৪৪
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত নয় মাসে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২৭০টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৫ হাজার ৮০৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৩২ হাজার ৪৩৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫ হাজার ৬৪৪ জন। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪ হাজার ৮২৭, বিএনপির ৬০৯, জামায়াতের ১৪৫, এনসিপির ৪৩ এবং চরমপন্থী গোষ্ঠীর ৩৭ জন রয়েছেন। এ ছাড়া নিয়মিত অভিযান ও বিভিন্ন অভিযোগে ৬৩ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি।
কারাগারে ৯৫ বন্দীর মৃত্যু, হেফাজতে ও নির্যাতনে ১২
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত নয় মাসে কারাগারে ৯৫ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪০ জন কয়েদি এবং ৫৫ জন হাজতি। মৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ২০, বিএনপির একজন এবং সাধারণ বন্দী হিসেবে নথিভুক্ত ৭৪ জন রয়েছেন।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে হেফাজতে ও নির্যাতনে ১২, গুলিতে দুজন এবং কথিত বন্দুকযুদ্ধে তিনজন নিহত হয়েছেন।
বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে পালানোর সময় পড়ে, পানিতে ডুবে ও অন্যান্য কারণে আরও অন্তত ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস।
নয় মাসে ৫১৮ সাংবাদিক আক্রান্ত
২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির ২৮৮টি ঘটনায় ৫১৮ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৯৭ জন আহত, ৮৭ জন লাঞ্ছিত, ৭৭ জন হুমকির মুখে এবং ২০ জন আটক হয়েছেন।
সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৬-এর অধীনে ৫১ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা হয়েছে।
এ সময়ে ৫৮টি সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ৪৩৯ জন আহত ও ৪৬ জন আটক হয়েছেন বলেও জানিয়েছে এইচআরএসএস।
নারী ও শিশু নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র
প্রতিবেদনে গত নয় মাসে ২ হাজার ৪০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৬৫৭ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৯২ জনের বয়স ১৮ বছরের কম।
এ সময়ে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৩০ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৯ জনকে এবং ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন দুজন। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৬৯৬ জন।
পারিবারিক সহিংসতায় ৪৫৭ নারী নিহত, ২৭৯ জন আহত এবং ২১৯ জন আত্মহত্যা করেছেন। একই সময়ে ১ হাজার ৮১০ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৪৯৪ জন প্রাণ হারিয়েছে।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও বসতবাড়ি
গত নয় মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলার ঘটনায় ৬২ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময়ে ২১টি মন্দির, ২০টি প্রতিমা ও ৪৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে চারটি।
শ্রমিক নির্যাতন ও কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিক নির্যাতনের ৫৮২টি ঘটনায় ১৪৫ জন নিহত ও ১ হাজার ২৬৩ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ ও সুরক্ষাসামগ্রীর অভাবে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন আরও ৩৯০ জন শ্রমিক।
সীমান্তে সহিংসতা ও প্রাণহানি
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের হামলার ৪৩টি ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ৩৯ জন আহত হয়েছেন। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২৪টি সহিংসতার ঘটনায় একজন নিহত, ছয়জন আহত এবং ৮৩ জন আটক হয়েছেন।
সীমান্ত এলাকায় আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে আটজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন স্থান থেকে ৪৯১ মরদেহ উদ্ধারের তথ্য
গত নয় মাসে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডের ৪৬৫টি ঘটনায় ৪৯১টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্ধার করা মরদেহের মধ্যে ৪৬টি ছিল বস্তাবন্দী, ৮৭টি ঝুলন্ত অবস্থায় এবং ৭৪টিতে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ ছাড়া ৩৫টি মরদেহের গলা কাটা এবং ৩১টির হাত-পা বাঁধা ছিল।
প্রতিবেদনে উঠে আসা এসব তথ্য দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জের চিত্র তুলে ধরে। রাজনৈতিক ও সামাজিক সহিংসতা প্রতিরোধ, হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত, নারী-শিশু ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।

