দুর্বল ইন্টারনেটেও স্মার্টফোনে চলবে ক্ষুদ্র এআই মডেল; স্থানীয় ভাষায় কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে সেবা বাড়ানোর সম্ভাবনা দেখছে সংস্থাটি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের পূর্ণ সুবিধা কাজে লাগাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অবিলম্বে ‘স্মল এআই’ বা ক্ষুদ্রাকৃতির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল তৈরিতে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, কম গতির ইন্টারনেট কিংবা দুর্বল সংযোগেও স্মার্টফোনে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য এসব মডেল স্থানীয় চাহিদা পূরণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ক্রমেই আরও জটিল ও উন্নত এআই পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত, তখন বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের চিফ নলেজ অফিসার পাসকল ডনাহিউ বলেছেন, এআই উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে সে জন্য প্রযুক্তিকে স্থানীয় বাস্তবতা ও প্রয়োজনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
স্থানীয় চাহিদায় কার্যকর ‘স্মল এআই’
স্মল এআই হলো বিশেষায়িত ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল, যা নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য বা কাজের জন্য তুলনামূলক ছোট ও নির্দিষ্ট ডেটাসেট ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বড় ও জটিল মডেলের তুলনায় এসব মডেল কম কম্পিউটিং সক্ষমতা ও শক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদনের উপযোগী করে তৈরি করা যায়।
ডনাহিউ বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, যেসব অংশীদার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আমরা কাজ করি, তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে পরিবর্তন আসতে হয়ত শতাব্দীর পর শতাব্দী লেগে যেত এই প্রযুক্তির ব্যবহারে তা এখন কেবল কয়েক দশকের মধ্যেই ঘটিয়ে ফেলা সম্ভব।”
স্মল এআইয়ের সুবিধা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “স্মল এআই এমন এক প্রযুক্তি যা স্থানীয় পরিবেশেই কার্যকর থাকবে, দুর্বল সংযোগ বা কম গতির ইন্টারনেটেও চলবে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় কাজ করবে, যা সহজেই মানুষের হাতের মোবাইল ফোনে পাওয়া যাবে।”
কৃষকের হাতে এআইভিত্তিক পরামর্শ
আয়ারল্যান্ডের সাবেক অর্থমন্ত্রী ডনাহিউ বিশ্বব্যাংকের কৃষিবিষয়ক উদ্যোগ ‘এগ্রিকানেক্ট’-এর উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভারতের অনেক কৃষক নিজেদের ভাষায় মাটির পুষ্টি ও রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণের তথ্য জানতে চান।
তিনি বলেন, “ভারতের প্রতিটি ক্ষুদ্র খামারে গিয়ে সেবা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত কৃষি বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞ খুঁজে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ঠিক এখানেই স্মল এআইয়ের ভূমিকা। এটা এমন প্রযুক্তি, যা একজন কৃষকের ফোনে থাকবে ও তার প্রয়োজনীয় তথ্যের সঠিক জোগান দেবে।”
বিশ্বব্যাংকের মতে, স্থানীয় ভাষায় কাজ করতে সক্ষম এবং তুলনামূলক কম শক্তিনির্ভর এআই প্রযুক্তি বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশ ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। কৃষি ছাড়াও স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে এ ধরনের প্রযুক্তি কাজে লাগানো সম্ভব।
তবে বিশেষায়িত এআই সেবা তৈরি ও বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দিতে বিশ্বব্যাংক, সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করে সংস্থাটি।
এআই ব্যবহারে মৌলিক অবকাঠামোর গুরুত্ব
এআইয়ের বিকাশ কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চলতি সপ্তাহে আয়োজিত বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
সোমবার প্রযুক্তির প্রভাববিষয়ক এক প্যানেল আলোচনায় আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এআইয়ের সফল ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “প্রথমত আপনার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত প্রয়োজন ডিজিটাল অবকাঠামো। পাশাপাশি মানুষকেও এই প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে। আর সরকারের দায়িত্ব সাইবার সুরক্ষা দেওয়া ও ক্ষতিকর অপব্যবহার থেকে জনগণকে রক্ষা করা, যাতে প্রযুক্তিটির সুফল সবাই নিরাপদে পেতে পারে।”
জর্জিয়েভার মতে, এসব মৌলিক ক্ষেত্রে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া গেলে এআইয়ের সুবিধা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। তিনি বলেন, “আমরা যদি এসব মৌলিক ক্ষেত্র নিশ্চিত করতে কঠোর পরিশ্রম করি তবে এআইয়ের প্রসার গণতান্ত্রিক হয়ে উঠবে, ঠিক যেভাবে মোবাইল ফোন মানুষের হাতে হাতে পৌঁছেছে সেভাবেই।”
বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের ঘাটতি বড় বাধা
এর আগে গত আগস্টে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট’-এ এআইয়ের বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, সাব-সাহারান আফ্রিকার গ্রামীণ এলাকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্কুলে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। আর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি স্কুলে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছায়নি।
এ ধরনের অবকাঠামোগত ঘাটতি এআই প্রযুক্তির ব্যবহার ও সুফল বিস্তারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল অবকাঠামোর অভাব রয়েছে, সেখানে বড় এআই মডেল ব্যবহার করা কঠিন।
এ কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ছোট, স্থানীয় ভাষাভিত্তিক ও কম সম্পদনির্ভর এআই মডেল তৈরির পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ঘাটতি দূর করাও জরুরি। বিশ্বব্যাংকের আহ্বানের মূল লক্ষ্য হলো, প্রযুক্তির সুবিধা যেন শুধু উন্নত অর্থনীতির দেশ বা বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ মানুষও তা কাজে লাগাতে পারে।

