অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্বজুড়ে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির শঙ্কা, ২০২৭ সাল পর্যন্ত থাকতে পারে চাপ

যুদ্ধ, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ও এল নিনোর প্রভাবে সংকুচিত হচ্ছে সরবরাহ; সবচেয়ে বেশি চাপে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং এল নিনো-সৃষ্ট খরার প্রভাবে খাদ্যশস্যের সরবরাহ সংকুচিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির চাপ আগামী কয়েক মাসে আরও তীব্র হতে পারে এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এরই মধ্যে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে চাল, গম, চিনি, রুটি ও ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের মানুষ, যাদের আয়ের বড় অংশই খাবার কেনার পেছনে ব্যয় হয়।

ইন্দোনেশিয়ার মধ্য জাকার্তার ৬৩ বছর বয়সী পার্কিং সহকারী মুহাম্মদ ইয়াসিন এই সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি এখন দৈনিক খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। চার সন্তানের জনক ইয়াসিন একটি মিনিমার্কেটের পাশে দাঁড়িয়ে মোটরসাইকেল পাহারা দেন।

তিনি বলেন, আগে ৭ থেকে ৮ হাজার রুপিয়ায় ভাত, তেম্পে ও টফু কিনতে পারতেন। এখন একই খাবারের দাম বেড়ে ১৫ হাজার রুপিয়ায় দাঁড়িয়েছে। অথচ সপ্তাহে তাঁর মোট আয় মাত্র ২ থেকে ৩ লাখ রুপিয়া।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ছে বিভিন্ন দেশে

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো টোরেরো বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। চলতি বছরের শেষ ভাগ, আগামী বছরের শুরু এবং সম্ভবত পুরো ২০২৭ সালজুড়েই এর আরও বড় প্রভাব দেখা যেতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্লেষণ করা ১৫০টি দেশের মধ্যে ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে ২২ শতাংশ দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চেয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল। আগের প্রান্তিকে এ হার ছিল ১৪ শতাংশ।

এদিকে এফএওর খাদ্য মূল্যসূচক সেপ্টেম্বরে গড়ে ১৩৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খাদ্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি জনঅসন্তোষ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রধান খাদ্য রপ্তানিকারক দেশগুলোকে রপ্তানি সীমিত বা নিষিদ্ধ করার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তেমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যুদ্ধ ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তাহীনতায় বাড়ছে ব্যয়

কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের শস্য অবকাঠামোয় হামলার কারণে গম সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বড় আমদানিকারক দেশ মিসর ও ইন্দোনেশিয়াকে বিকল্প উৎস থেকে গম সংগ্রহের কথা ভাবতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, লোহিত সাগর অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতার কারণে জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে পরিবহন সময় ও ব্যয় বাড়ছে। কৃষ্ণসাগর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে জাহাজভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার পরিবহন ও রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এল নিনোর প্রভাবে কমতে পারে ফসল উৎপাদন

আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যমূল্য বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে আবহাওয়ার বিরূপ পরিস্থিতিকে। এল নিনো-সৃষ্ট শুষ্ক আবহাওয়া ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ফসল উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। একই সময়ে সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।

ইন্দোনেশিয়ায় বৃষ্টিপাত দেরিতে হওয়ার পূর্বাভাসের মধ্যে চালের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ভারতে দুর্বল বর্ষার কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় চিনির দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলতি ২০২৬ সালে গমের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বড় মজুত থাকা সত্ত্বেও এশিয়ার প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চালের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ।

নেসলে ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনীষ তিওয়ারি বলেন, মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখন কঠিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

মিসর, ভারত ও উপসাগরীয় দেশগুলোতেও বাড়ছে দাম

মিসরে বড় আকারের ভর্তুকিবিহীন রুটির দাম জুলাইয়ের ৪ পাউন্ড থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৫ মিসরীয় পাউন্ডে দাঁড়িয়েছে। দেশটির রাজধানী কায়রোর কেন্দ্রস্থলের রুটি প্রস্তুতকারক সৈয়দ আবদেল হামিদ মোহাম্মদ জানান, শুধু ময়দার দামই নয়, বিদ্যুৎ, পানি, ইস্ট ও দক্ষ শ্রমিকের মজুরিসহ রুটি তৈরির প্রায় প্রতিটি খাতের ব্যয় বেড়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভোজ্যতেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়াতেও এ বছর উদ্ভিজ্জ তেলের দাম ৭ শতাংশ বেড়েছে।

ভারতে উৎপাদন ঘাটতির কারণে গত সেপ্টেম্বরে চিনি, পেঁয়াজ ও ডালের দাম আগের মাসের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমদানিকারকেরা ফিরছেন বিশ্ববাজারে

স্থানীয়ভাবে ভালো ফলনের কারণে যেসব খাদ্য আমদানিকারক দেশ এতদিন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনাকাটা কমিয়ে রেখেছিল, তারাও এখন আবার বিশ্ববাজারে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে।

লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিলের (আইজিসি) জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আলেকজান্ডার কারাভায়েতসেভ বলেন, আমদানিকারকদের বাজারে ফিরে আসার ফলে আগামী কয়েক মাসে চাহিদার বড় একটি নতুন ঢেউ তৈরি হতে পারে।

এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ টোরেরো জানান, গত মৌসুমের ভালো ফলন এবং বিশ্বব্যাপী রেকর্ড খাদ্য মজুত এতদিন বাজারে কিছুটা সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। তবে সেই মজুতের সীমাও ক্রমে ফুরিয়ে আসছে। ফলে খাদ্যপণ্যের দাম আরও স্পষ্টভাবে বাড়তে পারে।

খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন বেশি দামে কাঁচামাল কেনার চুক্তি নবায়ন করছে। এর সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন যুক্ত হয়ে আমদানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ায় গম আমদানি কমেছে ৪১ শতাংশ

ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম খাদ্য কোম্পানি পিটি ইন্দোফুডের পরিচালক ফ্রান্সিসকাস ভেলিরং বলেন, জাহাজভাড়া বৃদ্ধি এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইন্দোনেশীয় রুপিয়ার দরপতন পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

গম আমদানির চালান কমে যাওয়ায় জাকার্তার কয়েকটি ময়দা মিল তাদের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে ইন্দোনেশিয়ায় গম আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪১ শতাংশ কমে ৪ লাখ ৯১ হাজার মেট্রিক টনে নেমেছে।

সয়াবিন ও ভুট্টার সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ

বর্তমানে সয়াবিন ও ভুট্টার মজুত পর্যাপ্ত থাকলেও ভবিষ্যতে এসব শস্যের সরবরাহ অনেকাংশে আমেরিকা অঞ্চলের উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে তেল ও জ্বালানির দাম বাড়ায় জৈব জ্বালানি উৎপাদনে এসব শস্যের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে খাদ্য ও পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য বাজারে শস্যের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিলের এক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া বা আর্জেন্টিনার মতো প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোতে আবহাওয়া বিরূপ হলে বিশ্ববাজারে খাদ্যমূল্য আরও এক দফা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে যুদ্ধ, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা ও আমদানির চাহিদা একসঙ্গে খাদ্যবাজারে চাপ তৈরি করছে। বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দরিদ্র পরিবারগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা আরও দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন