অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে ১১ হাজারের বেশি নতুন ভাইরাসের সন্ধান

চীনা গবেষকদের শনাক্ত করা ১১ হাজার ৭৪২ ধরনের ভাইরাসের মধ্যে ১১ হাজার ৬৬২টিই আগে অজানা ছিল; গভীর সমুদ্রে খনিজ উত্তোলনে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতির আশঙ্কা

মেক্সিকো ও হাওয়াইয়ের মধ্যবর্তী প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে মূল্যবান ধাতব খনিজের বিশাল মজুত অনুসন্ধান করতে গিয়ে ১১ হাজার ৭৪২ ধরনের ভাইরাস শনাক্ত করেছেন চীনা গবেষকেরা। এর মধ্যে ১১ হাজার ৬৬২টি ভাইরাস আগে কখনো শনাক্ত হয়নি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ হাজার মিটার গভীরের পলির নমুনা বিশ্লেষণ করে এসব ভাইরাসের সন্ধান পাওয়া গেছে।

গবেষকদের এ আবিষ্কার গভীর সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সমুদ্রতল থেকে খনিজ উত্তোলন শুরু হলে সেখানকার অণুজীব ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

খনিজের বিশাল মজুত ক্ল্যারিয়ন-ক্লিপারটন অঞ্চলে

প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ল্যারিয়ন-ক্লিপারটন অঞ্চলের সমুদ্রতলে আলুর মতো আকৃতির কোটি কোটি ধাতব পিণ্ড ছড়িয়ে রয়েছে। পলিমেটালিক নডিউল নামে পরিচিত এসব পিণ্ডে নিকেল, কোবাল্ট ও ম্যাঙ্গানিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাতু রয়েছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, এ অঞ্চলে এসব ধাতুর মজুত স্থলভাগে থাকা মোট পরিচিত মজুতকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এখন পর্যন্ত অঞ্চলটিতে বাণিজ্যিকভাবে সমুদ্রতল থেকে খনিজ উত্তোলন শুরু হয়নি। তবে খনিজ অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক সমুদ্রতল কর্তৃপক্ষ (আইএসএ) ১৭টি চুক্তি দিয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি চুক্তি চীনের হাতে রয়েছে।

সম্প্রতি চীনা গবেষকদের একটি দল এ অঞ্চলের সমুদ্রতলের পলিতে থাকা ভাইরাস নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা চালিয়েছে। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে গভীর সমুদ্রে খনিজ উত্তোলনের অনুসন্ধান ও কার্যক্রম চালাতে গিয়ে মূল্যবান ধাতুর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক অজানা ভাইরাসেরও সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।

৬০টি নমুনায় ১১ হাজার ৭৪২ ধরনের ভাইরাস

গবেষণায় ক্ল্যারিয়ন-ক্লিপারটন অঞ্চলের সমুদ্রতলের পলির ৬০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এসব নমুনা ২০২৩ ও ২০২৪ সালে সংগ্রহ করা হয়েছিল। খনিজ অনুসন্ধানের চুক্তি পাওয়া চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না ওশান মিনারেল রিসোর্সেস আরঅ্যান্ডডি অ্যাসোসিয়েশন নমুনাগুলো সংগ্রহ করে।

নমুনা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ১১ হাজার ৭৪২ ধরনের ভাইরাস শনাক্ত করেন। এর মধ্যে ১১ হাজার ৬৬২টি, অর্থাৎ ৯৯ শতাংশেরও বেশি ভাইরাস ছিল বিজ্ঞানের কাছে আগে অজানা।

গবেষকেরা ভাইরাসগুলোর প্রোটিনের মিল বিশ্লেষণ করে সেগুলোর সঙ্গে সমুদ্রের পানি, গভীর সমুদ্রখাত এবং সমুদ্রতলের উষ্ণ প্রস্রবণ এলাকায় আগে শনাক্ত হওয়া ভাইরাসের তথ্য তুলনা করেন। এতে দেখা যায়, ক্ল্যারিয়ন-ক্লিপারটন অঞ্চলে পাওয়া ভাইরাসগুলোর প্রোটিন গুচ্ছের মাত্র প্রায় ৪ শতাংশের সঙ্গে বাইরের অন্তত একটি তথ্যভান্ডারে থাকা ভাইরাসের প্রোটিনের মিল রয়েছে।

এ ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, অঞ্চলটিতে এমন অনেক ভাইরাসের বংশধারা ও জিনগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এখনো সীমিত।

বাস্তুতন্ত্রে ভাইরাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

গবেষকদের ধারণা, ক্ল্যারিয়ন-ক্লিপারটন অঞ্চলের ব্যতিক্রমী পরিবেশের কারণে সেখানকার ভাইরাসগুলোর বৈশিষ্ট্যও স্বতন্ত্র হতে পারে। এ অঞ্চলে ভারী ধাতুর উপস্থিতি বেশি হলেও জীবের ব্যবহারের উপযোগী পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি রয়েছে।

শনাক্ত হওয়া ভাইরাসগুলোর বেশির ভাগই ‘কডোভিরিসিটিস’ শ্রেণির। এ ধরনের ভাইরাসের লেজের মতো গঠন থাকে, যার সাহায্যে তারা সিরিঞ্জের মতো করে ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে নিজেদের জিনগত উপাদান প্রবেশ করাতে পারে। সমুদ্র ও স্থলভাগের পাশাপাশি মানুষের অন্ত্রেও এ শ্রেণির ভাইরাসের দেখা মেলে।

এসব ভাইরাস সাধারণত মানুষের জন্য বিপজ্জনক নয়। এগুলো মূলত ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে এবং ধ্বংস করে। তবে সমুদ্রতলের পরিবেশে জৈব পদার্থ ভেঙে ফেলা এবং পুষ্টি উপাদান ছড়িয়ে দেওয়ার মতো প্রক্রিয়ায় ভাইরাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

খনিজ উত্তোলনে পরিবেশগত ঝুঁকি

গবেষকদের আশঙ্কা, সমুদ্রতল থেকে খনিজ উত্তোলনের সময় পলির স্তর নাড়াচাড়া হলে ভাইরাসগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে সমুদ্রতলের বাস্তুতন্ত্রে জৈব পদার্থের ভাঙন ও পুষ্টি উপাদানের পুনর্বণ্টনের মতো প্রক্রিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

গবেষণাটির প্রধান লেখক হৌ বোওয়েন বলেছেন, এ ফলাফল পলিমেটালিক নডিউলসমৃদ্ধ অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে ভাইরাসের ভূমিকা বুঝতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের জন্য খনিজ উত্তোলন শুরুর আগের অণুজীবের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করবে।

হৌ বোওয়েন চীনের চংকিং বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন দ্বিতীয় সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের যৌথ পিএইচডি শিক্ষার্থী। গত মাসের শেষ দিকে ‘নেচার কমিউনিকেশনস’ সাময়িকীতে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়।

গবেষণাটি গভীর সমুদ্রের অজানা জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে নতুন তথ্য দিলেও, খনিজ উত্তোলনের সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নে এ অঞ্চলের ভাইরাস ও অন্যান্য অণুজীবের ভূমিকা আরও বিস্তারিতভাবে বোঝার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন