চার কিলোমিটারজুড়ে ৬ হাজার ৫৮৫টি গাছ ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদ; উদ্যোগকে দেশের ৬৩ জেলার প্রশাসকদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বললেন তারেক রহমান
একসময় যেখানে ছিল বর্জ্যের বিশাল স্তূপ, অসহ্য দুর্গন্ধ আর দূষিত পরিবেশ, সেখানে এখন শোভা পাচ্ছে হাজারো সবুজ গাছপালা ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদ। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজার থেকে হেমায়েতপুর পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন বাগান ‘রূপান্তর’। দীর্ঘদিনের বর্জ্যের ভাগাড়কে সবুজে বদলে দেওয়ার এ উদ্যোগকে দেশের অন্য জেলার প্রশাসকদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১টায় আমিনবাজারে নিমগাছ রোপণের মাধ্যমে ‘রূপান্তর’ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি উদ্যোগটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমসহ সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ধন্যবাদ জানান।
পরিকল্পনা ও সদিচ্ছায় বদলে গেল পরিবেশ
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকলে একটি এলাকাকে মানুষের কল্যাণে কীভাবে সুন্দরভাবে পরিবর্তন করা যায়, আমিনবাজারের এই উদ্যোগ তার বড় প্রমাণ। আপনারা যারা এলাকাবাসী, তারা জানেন দুই মাস আগেও এই জায়গাটার কী অবস্থা ছিল। আর আজ প্রায় দুই মাস পরে এই জায়গাটির কী পরিবর্তন হয়েছে!”
তিনি বলেন, চার কিলোমিটার এলাকার মানুষের জন্য জায়গাটি এখন দেখতে যেমন ভালো লাগছে, তেমনি ভালো পরিবেশে শ্বাস নেওয়াও সহজ হয়েছে।
পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বাগানের সৌন্দর্য ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার উদ্যোগ নিয়ে এলাকাটিকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলেছে। এখন এ সৌন্দর্য ধরে রাখার দায়িত্ব এলাকাবাসীকেও নিতে হবে। জনগণ সরকারকে সহযোগিতা করলে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে সমাধান করা সম্ভব হবে এবং মানুষ বুক ভরে শ্বাস নিতে পারবে।
বাগান সম্প্রসারণে শিল্পকারখানার মালিকদের সম্পৃক্ত করার পরামর্শ
আমিনবাজারের এ উদ্যোগকে চার কিলোমিটার এলাকার বাইরেও বিস্তৃত করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসককে মহাসড়কের দুই পাশে থাকা মিল-কারখানার মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে আশপাশের ফাঁকা জায়গাগুলো ভাগ করে পরিচর্যার দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্যদের জেলা প্রশাসনকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী। বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলকে সবুজ ও পরিবেশবান্ধব করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অন্য ৬৩ জেলার জেলা প্রশাসকদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অন্য জেলার প্রশাসকেরাও এ ধরনের পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দুই দশকের বর্জ্যের স্তূপ সরিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বাগান
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই দশক ধরে আমিনবাজার এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে ময়লা-আবর্জনা ফেলে ৩০ ফুট পর্যন্ত উঁচু স্তূপ তৈরি করা হয়েছিল। এতে এলাকাটিতে তীব্র দুর্গন্ধ ও পরিবেশদূষণের সমস্যা দেখা দেয়।
গত জুলাই মাসে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বর্ষাকালীন মহড়া পরিদর্শনে যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বর্জ্যের ভাগাড় ও দুর্গন্ধ প্রত্যক্ষ করেন। পরে তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
এরপর ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের তত্ত্বাবধানে সাভার উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার সহযোগিতায় প্রায় তিন মাসের প্রচেষ্টায় জমে থাকা বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অপসারণ করা হয়। বর্জ্য সরানোর পর জমি প্রস্তুত করে বাগান গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়।
রোপণ করা হয়েছে ৬ হাজার ৫৮৫টি গাছ ও উদ্ভিদ
প্রকল্পের আওতায় জমি প্রস্তুত, মাটির সুরক্ষায় প্যালাসাইডিং, পানি নিষ্কাশনের জন্য ২০টি সারফেস ড্রেন এবং সার্ভিস শেড নির্মাণ করা হয়েছে। মাটির ক্ষয়রোধে লাগানো হয়েছে নেপিয়ার, দুর্বা ও বিন্নাসহ বিভিন্ন ধরনের ঘাস।
প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০ থেকে ২৫ মিটার চওড়া এ বাগানে বিভিন্ন প্রজাতির মোট ৬ হাজার ৫৮৫টি গাছ ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদ রোপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৫০টি নিমগাছ, ৩ হাজার ৮১৫টি সুপারি, ৬০টি তালগাছ, ৬৫০টি মাধবীলতা, ৪৫টি সিজিয়াম এবং ৭০০টি রঙ্গনগাছ।
সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎসহ পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো
বাগানটির পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর অংশ হিসেবে ২ কিলোওয়াটের সোলার প্যানেল ও ১ কিলোওয়াটের উইন্ড টারবাইন স্থাপন করা হয়েছে। এ দুই ব্যবস্থার মাধ্যমে মোট ৩ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রাতের আলোকসজ্জার জন্য স্থাপন করা হয়েছে ১২০টি বৈদ্যুতিক বাতি।
দীর্ঘদিনের বর্জ্যের স্তূপ সরিয়ে গাছপালা, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে রাজধানীর অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ আমিনবাজার এলাকার চেহারা বদলে গেছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, নিয়মিত পরিচর্যা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ‘রূপান্তর’ শুধু দৃষ্টিনন্দন বাগান হিসেবেই নয়, পরিবেশ সংরক্ষণে একটি কার্যকর উদ্যোগ হিসেবেও ভূমিকা রাখবে।

