দীর্ঘ ১০ বছর পর আগামীকাল রাজধানীতে নবনির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ এবং আধুনিকায়ন করা ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান আগামীকাল উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে প্রায় ২৩ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত উদ্যানটির আধুনিকায়নে ব্যয় হয়েছে ৯১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এতে থাকছে দুটি হ্রদ, ৬৫৬ মিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে এবং প্রায় ২৫ লাখ গ্যালন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা।
আগামীকাল সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকাল ১০টায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) উদ্যানটিকে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও জনবান্ধব গণপরিসর হিসেবে গড়ে তুলেছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যবহারযোগ্যতা হারানো এ উদ্যানের আধুনিকায়নে জলাধার সংরক্ষণ, সবুজায়ন, হাঁটার পথ, আধুনিক অবকাঠামো, আলোকায়ন ও নিরাপত্তাব্যবস্থাসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, এমপি এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, এমপির। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম। স্বাগত বক্তব্য দেবেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান।
৯১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিকায়ন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (দ্বিতীয় সংশোধিত) আওতায় ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৯১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর ৯৫ শতাংশ অর্থায়ন করা হয়েছে সরকারি বরাদ্দ থেকে এবং বাকি ৫ শতাংশ এসেছে ডিএসসিসির নিজস্ব তহবিল থেকে।
পাঁচটি প্যাকেজের মাধ্যমে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। উন্নয়নকাজে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নকশা, বিদ্যমান বড় গাছ ও জলাধার সংরক্ষণ এবং দর্শনার্থীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুটি হ্রদ ও ৬৫৬ মিটার ওয়াকওয়ে
উদ্যানটির আধুনিকায়নে পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি দুটি নতুন হ্রদ তৈরি করা হয়েছে। জলাধার ও সবুজ এলাকার সমন্বয়ে উদ্যানটিকে আরও নান্দনিক করে তোলা হয়েছে।
দর্শনার্থীদের চলাচলের সুবিধার্থে নির্মাণ করা হয়েছে ৬৫৬ মিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে। সড়ক থেকে প্রায় দুই মিটার উঁচু স্তরে হাঁটার পথ এবং এর প্রায় ২ দশমিক ৫ মিটার নিচের স্তরে গাড়ি পার্কিং ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া উদ্যানের প্রবেশপথ ও অভ্যন্তরীণ চলাচলের ব্যবস্থা উন্নত করা হয়েছে। লেকের পাড় সংরক্ষণে রিটেইনিং ওয়াল, ড্র-ওয়াল, জিওটেক্সটাইল ও সিসি ব্লকসহ বিভিন্ন সুরক্ষাব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।
উন্নয়নকাজের অংশ হিসেবে বাউন্ডারি ওয়াল, প্রবেশপথের সৌন্দর্যবর্ধন, মাঠ প্রস্তুতকরণ, ঘাস লাগানো ও সেচব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্যানিটারি সুবিধা, পানি সরবরাহ, গভীর নলকূপ, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, সাবস্টেশন, জেনারেটর, সিসিটিভি ও বহিরাঙ্গন আলোকায়নের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
২৫ লাখ গ্যালন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ
ওসমানী উদ্যানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা। উদ্যানের পদচারীপথের নিচে প্রায় ২৫ লাখ গ্যালন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাতের সময় পানি ধরে রেখে এ ব্যবস্থা আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতার চাপ কমাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজধানীতে জলাবদ্ধতা নিরসন ও বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা নগর কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে উদ্যানের ভেতরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। জলাধার সংরক্ষণ ও সবুজ এলাকা বজায় রাখার মধ্য দিয়ে নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও উদ্যানটি ভূমিকা রাখবে।
নগরবাসীর অবসর ও শরীরচর্চার সুযোগ
জলাধার, সবুজ এলাকা, হাঁটার পথ ও আধুনিক নাগরিক সুবিধার সমন্বয়ে ওসমানী উদ্যানকে হাঁটাচলা, শরীরচর্চা, পাঠাভ্যাস, বিনোদন ও অবসরযাপনের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে।
ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীতে উন্মুক্ত সবুজ পরিসরের অভাব দীর্ঘদিনের। আধুনিকায়নের ফলে পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত এ উদ্যান নগরবাসীর জন্য প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানো এবং সামাজিক মেলামেশার নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে স্মরণ করা হবে শহীদদের আত্মত্যাগ
ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়নের পাশাপাশি নবনির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ রাজধানীর নাগরিক পরিসরে নতুন সংযোজন। জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণে নির্মিত এ স্মৃতিস্তম্ভ তাঁদের আত্মত্যাগের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সবুজায়ন, জলাধার সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিকদের বিনোদন ও শরীরচর্চার সুযোগ সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে আধুনিকায়ন করা ওসমানী উদ্যান রাজধানীতে একটি পরিবেশবান্ধব ও জনবান্ধব গণপরিসর হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

