অনুসরণ করুন:
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের আগে বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক চুক্তি নিয়ে টোকিওর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

জাপানের পার্লামেন্টে অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির; প্রধানমন্ত্রীর সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে নতুন অগ্রগতির প্রত্যাশা

প্রান্তকাল ডেস্ক । ১৮ অক্টোবর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরের আগে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (Economic Partnership Agreement–EPA) নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে টোকিও। দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য জাপানের জাতীয় সংসদে (ডায়েট) পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির মন্ত্রিসভা।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত কার্যতালিকায় এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

জাপান সরকারের প্রকাশিত নথিতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বসংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে পার্লামেন্টের অনুমোদন চাওয়ার সিদ্ধান্তের উল্লেখ রয়েছে।

এমন এক সময়ে সিদ্ধান্তটি এলো, যখন আগামী ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে সামনে রেখে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনশক্তি সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রস্তুতি চলছে।

অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিতে নতুন অগ্রগতি

বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি দেওয়ার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে টোকিওতে দুই দেশের মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে ঢাকা ও টোকিওতে সাত দফা আলোচনার মাধ্যমে পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায় দুই দেশ।

বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের প্রায় ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

অন্যদিকে জাপানের ১ হাজার ৩৯টি পণ্য বাংলাদেশের বাজারে পর্যায়ক্রমে শুল্কমুক্ত অথবা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে।

এ ছাড়া তৈরি পোশাক খাতে ‘সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকায় কাঁচামালের উৎসসংক্রান্ত শর্ত সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য জাপানের বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়তে পারে।

তবে চুক্তির এসব সুবিধা কার্যকর হওয়ার বিষয়টি প্রয়োজনীয় আইনগত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।

২৬ অক্টোবর জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশের সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৬ অক্টোবর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান যাওয়ার কথা রয়েছে।

সফরকালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। জাপানের সম্রাট নারুহিতোর সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাতের সম্ভাবনার কথা কূটনৈতিক সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে।

এর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সফরের মেয়াদ চার দিন হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। ফলে চূড়ান্ত সফরসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

সফরে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দক্ষ জনশক্তি বিনিময়ের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।

জাপানের কাছে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে জাপানের কাছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রস্তাব উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ।

১৭ অক্টোবর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ১২টি অগ্রাধিকার খাতে এই বিনিয়োগ ও সহযোগিতা চাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত খাতগুলোর মধ্যে পরিবহন অবকাঠামো, নগর যোগাযোগ, মেট্রোরেল, গুরুত্বপূর্ণ সেতু, শিল্পাঞ্চল, জ্বালানি এবং প্রযুক্তি খাত উল্লেখযোগ্য।

পরিবহন ও নগর যোগাযোগ অবকাঠামোর জন্য প্রায় ৩৪৫ কোটি ডলার এবং মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক শিল্প ও বন্দর উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রায় ৩১৪ কোটি ডলারের সহযোগিতা চাওয়ার পরিকল্পনার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এটি বাংলাদেশের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজ; জাপানের পক্ষ থেকে অর্থায়নের চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি নয়।

জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা

প্রধানমন্ত্রীর সফরে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি অন্যতম আলোচ্য বিষয় হতে পারে।

জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ভাষাগত দক্ষতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পেশাগত যোগ্যতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এর আগে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নসংক্রান্ত একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

নতুন করে জনশক্তি সহযোগিতার চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রশিক্ষিত কর্মীদের জন্য জাপানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী জাপানি প্রতিষ্ঠান

প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতির মধ্যেই বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপানের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান মারুবেনি করপোরেশন।

১১ অক্টোবর ঢাকায় বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিদলের বৈঠকে সার উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং গাড়ি উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির বাস্তবায়ন এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

এদিকে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (JETRO) বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাজুইকি কাতাওকা প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরকে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পের বিকাশের একটি সম্ভাবনাময় সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ঢাকা–টোকিও সম্পর্কে নতুন মাত্রার প্রত্যাশা

বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী জাপান। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকার মেট্রোরেল এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা রয়েছে।

গত জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাপানি প্রতিনিধিদলের বৈঠকেও এসব প্রকল্পের অগ্রগতি, জ্বালানি সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়।

এবারের সফরকে সামনে রেখে ১৭ অক্টোবর ঢাকায় সফররত একটি জাপানি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপনের সঙ্গে বৈঠক করেছে।

বৈঠকে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী?

জাপানের মন্ত্রিসভায় অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির অনুমোদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।

বিশেষ করে শুল্ক সুবিধা, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্প বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রে নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ভর করবে চুক্তির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন, বাস্তবায়ন কাঠামো, বিনিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং দুই দেশের পরবর্তী কার্যক্রমের ওপর।

এখন নজর থাকবে ২৬ অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের দিকে। সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের বিষয়ে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত আসে, সেটিই হবে দুই দেশের সম্পর্কের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন