বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি মোছার মামলা: জামিন শুনানিতে হট্টগোল, আইনজীবীকে মারধর

রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সভাপতি আয়াস ও রিমির জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মোছার চেষ্টার ঘটনায় করা মামলায় রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সভাপতি আল নুর মোহাম্মদ আয়াস ও মারজিয়া খন্দকার রিমির জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে আদালতে হট্টগোল ও মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় আসামিপক্ষের এক আইনজীবীকে কয়েকজন আইনজীবী মারধর করেন। পরিস্থিতি দেখে এজলাস ছেড়ে চলে যান বিচারক।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিয়াদ হাসানের আদালতে এ ঘটনা ঘটে। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে বিচারক এজলাসে ফিরে আসামিদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

মামলার সূত্রপাত গত শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির বিপরীত পাশে ফুটপাতসংলগ্ন দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মোছার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে। ওই সময় আয়াসসহ একদল তরুণ গ্রাফিতিটি মুছতে গেলে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। এ নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার পর আয়াসসহ চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।

আটক অন্য তিনজন হলেন মারজিয়া খন্দকার রিমি, সাকিবুল হাসান ও সুজন মিয়া। ঘটনাস্থলে এক নারীকে গ্রাফিতিতে কালি দিতে দেখা যায়। এ সময় এক পুলিশ সদস্য তাঁকে বাধা দেন। ওই নারী দাবি করেন, তাঁরা ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানাতে এসেছেন। পরে আয়াসের নেতৃত্বে সেখানে স্লোগানও দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় শনিবার শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জিয়াউল হক আটক চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিদ্বেষ ছড়ানো ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ আনা হয়।

রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির

গত রোববার আদালত মারজিয়া খন্দকার রিমি ও সুজন মিয়াকে দুই দিন এবং আয়াস ও সাকিবুল হাসানকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠান। মঙ্গলবার রিমান্ড শেষে সাকিবুল হাসান ও সুজন মিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়।

বুধবার আয়াস ও রিমিকে রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই আব্দুল গাফফার হিমেল তাঁদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।

আবেদনে বলা হয়, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য পলাতক আসামিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, যা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সুষ্ঠু তদন্ত, আসামিদের নাম-ঠিকানা যাচাই এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কারাগারে রাখা প্রয়োজন। তদন্তের স্বার্থে ভবিষ্যতে আবারও রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জামিন শুনানিতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

বিকেল ৪টা ১০ মিনিটের দিকে আয়াস ও রিমিকে আদালতের এজলাসে তোলা হয়। তাঁদের পক্ষে আইনজীবী মনির হোসেন সুমন জামিনের আবেদন জানিয়ে শুনানি করেন।

তিনি বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে যে ধারায় মামলা করা হয়েছে, তা তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেউ ভালোবাসেন, আবার কেউ তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেন—এমন বক্তব্য তুলে ধরে তিনি আসামিদের জামিন চান। আয়াস অসুস্থ বলেও আদালতকে জানান তিনি।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জামিনের বিরোধিতা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, পাকিস্তান, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও ভারতকে সামনে এনে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর দাবি, রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার মাধ্যমে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উসকানি তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।

শুনানিতে তিনি আসামিপক্ষের আইনজীবীদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও মন্তব্য করেন। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আল মহসিন তৌহিদ তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান।

আইনজীবীকে মারধর, এজলাস ছাড়েন বিচারক

আল মহসিন তৌহিদের প্রতিবাদের পর রাষ্ট্রপক্ষে থাকা কয়েকজন আইনজীবী তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হন। একপর্যায়ে তাঁরা এগিয়ে এসে তৌহিদকে কিল-ঘুষি মারতে শুরু করেন। ধস্তাধস্তির মধ্যে তাঁর শার্ট ছিঁড়ে যায়। পরে কয়েকজন আইনজীবী তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে নেন।

আদালতকক্ষে এ পরিস্থিতি দেখে বিচারক রিয়াদ হাসান এজলাস ছেড়ে চলে যান। তখনো হট্টগোল চলতে থাকে। কয়েক মিনিট পর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী ও আসামিপক্ষের আইনজীবী মনির হোসেন সুমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আয়াস প্রসিকিউটরের উদ্দেশে বলেন, তিনি ক্ষমা চেয়েছেন এবং এসব ঘটনার মাধ্যমে তাঁর জীবন ধ্বংস না করার অনুরোধ জানান। আইনজীবী আল মহসিন তৌহিদের উদ্দেশেও তিনি বলেন, তাঁকে তিনি চেনেন না এবং কেন তিনি সেখানে এসেছেন, তা জানতে চান।

জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

প্রায় ১৫ মিনিট পর পরিস্থিতি শান্ত হলে বিচারক আবার এজলাসে ফিরে আসেন। আদালতকক্ষে আইনজীবীকে মারধর ও হট্টগোলের ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বিষয়টা খুবই খারাপ লাগল। আপনাদের কাছে এটা আশা করিনি।”

এরপর বিচারক আয়াস ও রিমির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাঁদের আদালত থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় আয়াস প্রশ্ন করেন, তিনি কি খুন করে এসেছেন যে তাঁকে এভাবে নেওয়া হচ্ছে। পরে তাঁকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন