মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিশু আছিয়া ধর্ষণ-হত্যা: হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল, দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি

মাগুরার বহুল আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। ডেথ রেফারেন্স ও আসামির আপিলের ওপর শুনানি শেষে সোমবার (৩১ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

হাইকোর্টের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহত শিশু আছিয়ার মা ও মামলার বাদী আয়েশা আক্তার। একই সঙ্গে সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুততম সময়ে হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

রায়ের পর আয়েশা আক্তার বলেন, তাঁর মেয়ের হত্যার ঘটনায় তিনি ন্যায়বিচার পেয়েছেন। এখন দ্রুত মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর দেখতে চান তিনি।

মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হাসান তারেক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল রোহানী সিদ্দীকা ও মাহবুবা তাসনিম আঁখি। আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হাফিজুর রহমান খান শুনানি করেন।

হাইকোর্টের রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, হিটু শেখ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছিলেন। তাঁর জবানবন্দি, ডিএনএ পরীক্ষার ফলসহ মামলার বিভিন্ন আলামত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, হিটু শেখ ঘটনার পর পালিয়ে গিয়ে একটি ক্ষেতে লুকিয়েছিলেন। পরে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। জবানবন্দিতে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনাও করেছিলেন।

পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছিল—আসামিপক্ষের এমন যুক্তির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, নির্যাতনের শিকার হলে জবানবন্দি দেওয়ার সময় হিটু শেখ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বিষয়টি জানাতে পারতেন। কিন্তু তিনি এমন কোনো অভিযোগ করেননি। এ কারণে আদালত তাঁর জবানবন্দিকে স্বেচ্ছায় দেওয়া ও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করেছেন।

যেভাবে ঘটেছিল ঘটনা

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৫ মার্চ রমজানের ছুটিতে মাগুরা শহরের নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে যায় আট বছরের শিশু আছিয়া। সেখানেই সে ধর্ষণের শিকার হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। এ ঘটনায় শিশুটির বোনের শ্বশুর হিটু শেখের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ওঠে।

গুরুতর আহত অবস্থায় আছিয়াকে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় আছিয়ার মা আয়েশা আক্তার বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করে।

২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। ২৭ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে ৭ মে তা শেষ হয়। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়।

পরে ১৩ মে উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান রায় ঘোষণা করেন। রায়ে হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

মামলার অপর তিন আসামি—শিশুটির বোনের স্বামী সজীব শেখ (১৯), সজীবের ছোট ভাই (১৭) ও সজীবের মা জাহেদা বেগম (৪০)—খালাস পান।

হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল

বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পর আইন অনুযায়ী তা কার্যকর করার আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এ জন্য মামলার নথি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২১ মে মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পরে পেপারবুক প্রস্তুত শেষে মামলাটি শুনানির জন্য হাইকোর্টের বিশেষায়িত বেঞ্চের কার্যতালিকায় আসে।

গত ১১ আগস্ট এ মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আসামির আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। শুনানি শেষে সোমবার হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।

হাইকোর্টের এ রায়ের পর আছিয়ার পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, পরবর্তী সব আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যবস্থা করা হবে।

শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি মাগুরায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন সময় স্থানীয়ভাবে প্রতিবাদ ও কর্মসূচিও পালিত হয়। হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকায় মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ধাপ সম্পন্ন হলো।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন