সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬

গুমে জড়িত ব্যক্তি যত ক্ষমতাবানই হোক, বিচার হবে: রাষ্ট্রপতি

‘স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না’; গুমের শিকার পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিতে রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান

গুমের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অপরাধী যত বড় ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ বা গোপন বন্দিশালা থাকতে দেওয়া হবে না। গুমের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

রোববার (৩০ আগস্ট) সকাল ১১টায় রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো পরিবারকে স্বজন হারানোর অনিশ্চয়তা ও বেদনা নিয়ে জীবন কাটাতে না হয়।

‘প্রতিশোধ নয়, প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে’

রাষ্ট্রপতি বলেন, বিগত দেড় দশকে দেশে গুম ও গোপন বন্দিশালার একটি ভয়াবহ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, তাদের অনেকেই গুম ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এসব গুরুতর অভিযোগ অস্বীকার করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রপতি বলেন, এখন সময় প্রতিশোধ নেওয়ার নয়; বরং প্রতিকার নিশ্চিত করার। প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে প্রচলিত আইন ও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

অতীতের অন্যায়ের বিচার করতে গিয়ে নতুন কোনো অন্যায় যেন সৃষ্টি না হয়—রাষ্ট্রের কার্যক্রমে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

‘গুম একটি পরিবারকেও ধ্বংস করে’

গুমকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি গুমের ঘটনা শুধু একজন মানুষকে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে না; এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর।

স্বজন হারানোর অনিশ্চয়তা একটি পরিবারের হাসি, শান্তি ও স্বপ্ন কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনেও দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। গুমের মাধ্যমে এসব সাংবিধানিক অধিকার একসঙ্গে লঙ্ঘিত হয়।

দেশে গুম ও গোপন আটকের মাধ্যমে যে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, তাকে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক ও অপমানজনক অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ

বক্তব্যে বিভিন্ন সময়ে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি।

তিনি বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী, সাবেক কাউন্সিলর চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম সুমন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমান এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আজমীসহ গুমের শিকার বিভিন্ন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন।

রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পাশাপাশি কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, নারী ও সাধারণ নাগরিকরাও বিভিন্ন সময়ে গুমের শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথাও স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া গুম, খুন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং এসব ঘটনার একদিন বাংলাদেশের মাটিতে বিচার হবে বলে বিশ্বাস করতেন।

রাষ্ট্রপতি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং গুমবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের অবদানের কথাও তুলে ধরেন।

গুমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন সোচ্চার থাকা সানজিদা ইসলাম তুলির ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণ করেন তিনি।

শুধু বিচার করলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ নয়

গুমের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি।

তিনি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারগুলোর মর্যাদা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এসব পরিবারের চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা, জীবিকা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনের দায়িত্ব গ্রহণে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

দীর্ঘ সময় ধরে স্বজনের সন্ধান না পাওয়া পরিবারগুলোর অনেকেই আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ন্যায়বিচারের পাশাপাশি তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতেও রাষ্ট্রকে ভূমিকা রাখতে হবে।

‘মতপার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়’

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় চরিত্র কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়েও বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপতি।

তিনি বলেন, দেশে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু সেই মতপার্থক্য রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় রূপ নিতে দেওয়া যাবে না। নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং একই সঙ্গে ভয়ের সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয় ক্ষমতা রাষ্ট্রের থাকবে, তবে আইনের নামে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার লঙ্ঘনের সুযোগ কারও থাকা উচিত নয়।

রাষ্ট্রের ক্ষমতা সবসময় সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণে থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।

শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই উন্নয়নের মাপকাঠি নয়

রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি দেশের সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।

একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, কল্যাণমুখী, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং সেই রাষ্ট্রে নাগরিকরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারছেন—সেটিও প্রকৃত উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশকে এমন রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না; আইনশৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু আইনের নামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না।

গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের বিচার দাবি

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

তারা গুমের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং যথাযথ বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তারা।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।

অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সরকারি কর্মকর্তা, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন