অনুসরণ করুন:
সোমবার, ১ জুন ২০২৬

সরকার দাম বাড়ালেও বাজারে ধস, চামড়া বিক্রি করে লোকসানে ব্যবসায়ী-মাদরাসা

কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার মূল্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকার ঘোষিত দামের তুলনায় অনেক কম মূল্যে চামড়া বিক্রি হয়েছে। এতে মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদরাসা, এতিমখানা ও কোরবানির চামড়া সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

সরকার চলতি বছর ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করে, যা গত বছরের তুলনায় দুই টাকা বেশি। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই মূল্য কার্যকর হয়নি। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ছোট আকারের গরুর চামড়া ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, মাঝারি আকারের চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা এবং বড় আকারের চামড়া ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ সরকারি দর অনুযায়ী একটি মাঝারি আকারের চামড়ার মূল্য হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা।

রাজধানীর বৃহত্তম কাঁচা চামড়ার বাজার লালবাগের পোস্তায় গিয়ে দেখা গেছে, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত মূল্য থেকে অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতি বছর সরকার দাম ঘোষণা করলেও কার্যকর বাজার তদারকির অভাবে কিছু প্রভাবশালী আড়তদার ও ট্যানারি মালিক বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন।

পোস্তা বাজারে ২০ পিস গরুর চামড়া নিয়ে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ী আকমল হোসেন বলেন, গত বছর যে ধরনের চামড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন, এবার সেই একই চামড়ার জন্য ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকার বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পরিবহন, শ্রমিক ও সংরক্ষণ খরচ বাদ দিলে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনও উঠছে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করতে লবণ, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয়সহ গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু বাজারে অধিকাংশ চামড়া বিক্রি হয়েছে এমন দামে, যা খরচের তুলনায় অত্যন্ত কম।

এবারও ছাগলের চামড়ার বাজারে একই চিত্র দেখা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতি পিস ছাগলের চামড়া ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কোথাও কোথাও বিনামূল্যেও চামড়া দিয়ে দিতে হয়েছে। ফলে ছাগলের চামড়া এখন অনেকের কাছে সম্পদ নয়, বরং বোঝায় পরিণত হয়েছে।

চামড়া ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা মূলত ট্যানারি মালিক ও বড় আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। তারা যে দর নির্ধারণ করেন, সেই দামের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে সরকার নির্ধারিত মূল্য কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে বাজার পরিচালিত হচ্ছে অন্য নিয়মে।

তবে ট্যানারি মালিকরা কম দামে চামড়া কেনার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাখাওয়াত উল্লাহ দাবি করেছেন, গত বছরের তুলনায় চামড়ার দাম কমেনি, বরং কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে। তাঁর মতে, ঈদের দিন দুপুর পর্যন্ত বাজার পুরোপুরি সক্রিয় না হওয়ায় কোথাও কোথাও কম দামে বিক্রি হয়ে থাকতে পারে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি টিপু সুলতান দাবি করেন, বেশিরভাগ লেনদেন সরকারি দামের মধ্যেই হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা এই দাবির সঙ্গে একমত নন।

চামড়ার বাজারে দরপতনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে দেশের মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোতে। প্রতিবছর কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের লিল্লাহ বোর্ডিং, এতিমখানা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ব্যয়ের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ছে।

দক্ষিন পাইক পাড়ার আশরাফুল উলুম মাদরাসার অধ্যক্ষ মুফতি হাবিবুর রহমান বলেন, পরিকল্পিতভাবে চামড়া খাতকে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও বড় সংকটে পড়বে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার প্রতিবছর মূল্য নির্ধারণ করলেও সেই মূল্য কার্যকর করার জন্য শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা, বাজারে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত চামড়া খাতের সংকট কাটবে না। ফলে ক্ষতির বোঝা বহন করতে হবে মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোকেই।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন