শুক্রবার, ১ মে ২০২৬

নৌ-অবরোধে ধাক্কা: রিয়ালের দরপতন, চাপে ইরানের অর্থনীতি

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের প্রভাব পড়েছে দেশটির অর্থনীতিতে। জাতীয় মুদ্রা রিয়াল ডলারের বিপরীতে নতুন নিম্নস্তরে নেমে গেছে, একই সঙ্গে বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতেও চাপ বাড়ছে।

বুধবার খোলা বাজারে ইরানি রিয়ালের দর একপর্যায়ে প্রতি ডলারে ১৮ লাখ ১০ হাজারে পৌঁছায়, যদিও পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রায় ১৫ লাখ ৪০ হাজারে লেনদেন হয়। চলতি সপ্তাহের শুরুতে এই হার ছিল আরও কম, আর এক বছর আগে তা ছিল প্রায় ৮ লাখ ১১ হাজার রিয়াল।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মিলেই মুদ্রার এই অবমূল্যায়ন ঘটছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ, যা ইরানের বাণিজ্য কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে।

ইরান সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোকে জরুরি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছে। পাশাপাশি সার্বভৌম তহবিল থেকে ১ বিলিয়ন ডলার খাদ্য আমদানিতে বরাদ্দ করা হয়েছে। মূল্য নিয়ন্ত্রণে ভর্তুকিযুক্ত বিনিময় হার পুনরায় চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

নন-অয়েল বাণিজ্যে বড় ধাক্কা

সরকারি তথ্যমতে, যুদ্ধের কারণে ইরানের নন-অয়েল বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। ইরানি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গত অর্থবছরে মোট নন-অয়েল বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ কম।

যুদ্ধ শুরুর পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যের পরিমাণ আরও কমে গেছে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত মাসিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার, যা শেষ মাসে নেমে আসে ৬.৪৬ বিলিয়নে—প্রায় ২৯ শতাংশ হ্রাস।

হরমুজ প্রণালি-তে উত্তেজনা ও জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়াও এ পতনের অন্যতম কারণ। এছাড়া বিভিন্ন বন্দর, বিমানবন্দর, রেল নেটওয়ার্ক ও শিল্প স্থাপনায় হামলার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

শিল্প ও জ্বালানি খাতে চাপ

ইরানের ইস্পাত, পেট্রোকেমিক্যাল, তেল-গ্যাস স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও হামলার শিকার হয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বজায় রাখতে সরকার সাময়িকভাবে ইস্পাত, রাসায়নিক ও পলিমারসহ কিছু পণ্যের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ইরানের তেল রপ্তানি কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন বাহিনী ইরানসংলগ্ন জলপথে জাহাজ তল্লাশি জোরদার করেছে এবং তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে।

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন, ইরানের অর্থ প্রবাহের সব পথ নজরদারির আওতায় আনা হবে।

চীন-নির্ভরতা বাড়ছে

ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা চীন। মার্চ মাসে দেশটি দৈনিক প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল আমদানি করলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তা কমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে চীন-ইরান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৫৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কম। মার্চ মাসে এই বাণিজ্য আরও কমে মাত্র ১৮৪ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রভাব

ইরানের একটি বড় বাণিজ্য অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাত-এর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি দেশটির অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর আমিরাত ইরানি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা, নাগরিকদের চলে যাওয়ার নির্দেশসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব কারণে ইরান এখন আঞ্চলিকভাবে তুরস্ক, ইরাক ও পাকিস্তানের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

সব মিলিয়ে, চলমান সংঘাত ও অবরোধ ইরানের অর্থনীতিকে বহুমাত্রিক চাপে ফেলেছে, যার প্রভাব মুদ্রা, বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন