শুক্রবার, ১ মে ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় গালফ দেশগুলোর যৌথ প্রকল্পে নতুন গতি

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের পর প্রথমবারের মতো সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ-এ বৈঠকে বসেছেন উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা। নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বিভিন্ন যৌথ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

Gulf Cooperation Council (জিসিসি)-এর অধীনে এসব প্রকল্প পরিবহন, জ্বালানি, পানি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে বিস্তৃত। লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করা এবং সম্মিলিত নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানো।

গালফ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ থমাস বনি জেমস বলেন, ইরানের হামলার পর এসব প্রকল্পের গুরুত্ব নতুনভাবে নির্ধারিত হয়েছে। আগে এগুলো অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলেও এখন এগুলো নিরাপত্তা প্রয়োজনীয়তায় রূপ নিয়েছে, যা বাস্তবায়নে জরুরিতা বাড়িয়েছে।

একীভূত রেল নেটওয়ার্কে নতুন গতি

২০০৯ সালে অনুমোদিত জিসিসি রেল প্রকল্পটি অঞ্চলের অন্যতম বড় অবকাঠামো পরিকল্পনা। প্রায় ২ হাজার ১১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ কুয়েত সিটি থেকে শুরু হয়ে মাস্কাট পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার কথা, যা সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সংযুক্ত করবে।

যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য পরিকল্পিত এই নেটওয়ার্কে ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। তবে বিভিন্ন নীতি, সীমান্ত ও কারিগরি সমন্বয়ের জটিলতায় প্রকল্পটি বিলম্বিত হয়েছে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশেষ করে সীমান্ত পণ্য পরিবহন রুটগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ গ্রিডে সফল আঞ্চলিক সংযোগ

জিসিসির সবচেয়ে সফল প্রকল্পগুলোর একটি হলো আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থা। ১৯৯৭ সালে অনুমোদিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো বিদ্যুৎ ভাগাভাগি করতে পারছে। ২০১৪ সালে পুরো নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে চালু হয়।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমানো, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিনিময় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি সফল উদাহরণ।

পানি নিরাপত্তায় নতুন উদ্যোগ

জ্বালানি সমৃদ্ধ হলেও উপসাগরীয় দেশগুলো পানি সংকটে ভুগছে। এ কারণে ২০১২ সালে ‘গালফ ওয়াটার ইন্টারকানেকশন’ প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়, যার লক্ষ্য বিভিন্ন দেশের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা যুক্ত করা।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে জরুরি সময়ে দেশগুলো একে অপরকে পানি সরবরাহ করতে পারবে। তবে পরিবেশগত ও কারিগরি চ্যালেঞ্জের কারণে এখনো বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, পানি অবকাঠামোতে হামলার ঝুঁকি এ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়েছে।

জ্বালানি পাইপলাইনে সমন্বয় জোরদার

তেল ও গ্যাস খাতে সহযোগিতা জিসিসির মূল ভিত্তি। এখন আঞ্চলিক পাইপলাইন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে পরিবহন খরচ কমবে এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবকাঠামোতে একীভূত হলেও উৎপাদন নীতিতে দেশগুলো আলাদা অবস্থান রাখতে পারে—এটাই বর্তমান বাস্তবতা।

সম্মিলিত ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা ব্যবস্থা

নিরাপত্তা জোরদারে জিসিসি দেশগুলো যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে। স্যাটেলাইট ও রাডার প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরি করা হবে।

এ ধরনের ব্যবস্থা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন বেসামরিক অবকাঠামো—যেমন বিদ্যুৎ, পানি ও পরিবহন—কেও নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা জিসিসি দেশগুলোকে শুধু অর্থনৈতিক নয়, নিরাপত্তা সহযোগিতার দিক থেকেও আরও ঘনিষ্ঠভাবে এগিয়ে যাওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন