শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে কঠোর আইন, অবহেলায় জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান

সন্তানের সাফল্য, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে জীবনের সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়া পিতা-মাতার অনেকেই বার্ধক্যে এসে অবহেলা, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং একাকীত্বের শিকার হন। এমন বাস্তবতায় পিতা-মাতার অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে প্রণয়ন করে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’। আইনে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণকে শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক যত্নের বিষয়টিও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়া, নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা এবং পারিবারিক মূল্যবোধের পরিবর্তনের কারণে অনেক বয়স্ক পিতা-মাতা প্রয়োজনীয় সেবা ও সম্মান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে আইনটি প্রবীণদের অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আইনের ২ ধারায় ‘ভরণ-পোষণ’ বলতে পিতা-মাতার খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান এবং তাদের প্রয়োজনীয় সময়, সঙ্গ ও পরিচর্যা নিশ্চিত করাকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কেবল অর্থ প্রদান করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; পিতা-মাতার প্রতি মানবিক ও সামাজিক দায়িত্বও পালন করতে হবে।

আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক সক্ষম সন্তান তার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে বাধ্য। একাধিক সন্তান থাকলে তারা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারবেন। আইনটি আরও বলছে, প্রত্যেক সন্তানকে সাধ্যমতো পিতা-মাতার সঙ্গে একই স্থানে বা নিকটবর্তী স্থানে বসবাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

এ আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কোনো সন্তান তার পিতা বা মাতাকে কিংবা উভয়কে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোনো স্থানে থাকতে বাধ্য করতে পারবে না। ফলে প্রবীণ পিতা-মাতাকে জোরপূর্বক পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করার বিরুদ্ধে আইনগত সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে।

এছাড়া সন্তানদের নিয়মিত পিতা-মাতার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেওয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পরিচর্যা এবং মানসিক সহায়তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পিতা-মাতা আলাদাভাবে বসবাস করলে সন্তানদের নিয়মিত তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক সন্তান তার দৈনিক, মাসিক বা বার্ষিক আয়ের সামর্থ্য অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত পিতা-মাতাকে প্রদান করবে।

আইনের ৪ ধারায় দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভরণ-পোষণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পিতার অনুপস্থিতিতে দাদা-দাদীর এবং মাতার অনুপস্থিতিতে নানা-নানীর ভরণ-পোষণের দায়িত্বও সন্তানদের ওপর বর্তাবে। এ দায়িত্ব পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের অংশ হিসেবেই গণ্য হবে।

আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো সন্তান যদি ভরণ-পোষণ সংক্রান্ত বিধান লঙ্ঘন করে, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

শুধু সন্তান নয়, কোনো সন্তানের স্ত্রী বা স্বামী, পুত্র-কন্যা কিংবা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি পিতা-মাতা, দাদা-দাদী বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণে বাধা সৃষ্টি করেন বা অসহযোগিতা করেন, তবে তাকেও সহায়তাকারী অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হবে। তাদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের শাস্তির বিধান প্রযোজ্য।

তবে আইনটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী, ভুক্তভোগী পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ছাড়া আদালত এ আইনের অধীনে কোনো অপরাধ আমলে নিতে পারবেন না। অর্থাৎ মামলা করার উদ্যোগ পিতা-মাতা বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকেই নিতে হবে।

আইনের ৮ ধারায় পারিবারিক বিরোধ আদালতের বাইরে মীমাংসার সুযোগ রাখা হয়েছে। আদালত চাইলে অভিযোগটি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্য, পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর, সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর অথবা অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে পাঠাতে পারবেন। তারা উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করবেন। এ ধরনের আপস-নিষ্পত্তি আদালত কর্তৃক অনুমোদিত বলে গণ্য হবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে আগামী দশকগুলোতে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন শুধু একটি শাস্তিমূলক আইন নয়; বরং এটি পারিবারিক দায়িত্ববোধ, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো।

সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং প্রবীণদের প্রতি সম্মানবোধ জাগ্রত করাও জরুরি। কারণ পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও। তাই বার্ধক্যে পিতা-মাতার পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি সন্তানের কর্তব্য এবং একটি মানবিক সমাজ গঠনের অন্যতম শর্ত।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন