অনুসরণ করুন:
বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬

এআই বুমে উড়ছে তাইওয়ানের অর্থনীতি, বাড়ছে বৈষম্য ও ‘দ্বৈত সমাজ’ নিয়ে উদ্বেগ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বৈশ্বিক বিস্ফোরণের ফলে তাইওয়ানের অর্থনীতি অভূতপূর্ব গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশই এখন তাইওয়ানে তৈরি হচ্ছে, যা ChatGPT কিংবা Claude এর মতো আধুনিক এআই মডেল পরিচালনায় ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এই সাফল্যের মধ্যেও দেশটিতে আয় বৈষম্য, আবাসন সংকট এবং ‘দ্বৈত অর্থনীতি’ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

তাইওয়ানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ASUS–এর এক প্রকৌশলী লি আল জাজিরাকে বলেন, এআই বিপ্লব তাইওয়ানের প্রযুক্তি খাতকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। তিনি বিশেষভাবে জুন মাসে অনুষ্ঠিতব্য কম্পিউটেক্স প্রযুক্তি ও এআই প্রদর্শনীর কথা উল্লেখ করেন।

তবে একইসঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রযুক্তি খাতের বাইরের মানুষরা এই অর্থনৈতিক উত্থানের সুফল সমানভাবে পাচ্ছেন না। তার ভাষায়, “প্রযুক্তি খাতের বাইরে কাজ করা আমার অনেক সহপাঠী ততটা ভালো অবস্থায় নেই। মূলত এই প্রযুক্তি ঢেউয়ের সামনের সারির শিল্পগুলোই লাভবান হচ্ছে।”

তাইওয়ানের অর্থনীতি বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি। ২০২৫ সালে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৬৯ শতাংশে।

গত বছর দেশটির রপ্তানি ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৬৪০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য ও সেবা।

বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এখন তাইওয়ানের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। মার্কিন বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী, এককভাবে সেমিকন্ডাক্টর খাত দেশটির জিডিপির ২০ শতাংশের বেশি অবদান রাখছে। এর বড় অংশ উৎপাদন করছে Taiwan Semiconductor Manufacturing Company বা টিএসএমসি, যার প্রধান গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে Nvidia ও Apple।

শুধু টিএসএমসিই তাইওয়ানের শেয়ারবাজারের মোট মূল্যের ৪০ শতাংশের বেশি প্রতিনিধিত্ব করছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, একটি মাত্র শিল্পের ওপর এত বেশি নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ইয়াং চিন-লুং ইতোমধ্যে “K-shaped economy” বা দ্বিমুখী অর্থনীতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যেখানে একটি অংশ দ্রুত উন্নতি করছে, অন্য অংশ স্থবির হয়ে পড়ছে।

যদিও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প দেশটির অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এই খাতে কর্মসংস্থান তুলনামূলক কম। ১ কোটি ১০ লাখ শ্রমশক্তির মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে কাজ করেন মাত্র প্রায় ৩ লাখ মানুষ। অন্যদিকে সেবা খাতে নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় ৭০ লাখ মানুষ।

তাইওয়ানের অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ জেমস লিন বলেন, ১৯৭০ থেকে ১৯৯০ দশকে দেশটির অর্থনীতি ছোট ও মাঝারি পারিবারিক ব্যবসা দ্বারা চালিত হতো। তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজজুড়ে তুলনামূলকভাবে বেশি ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন বড় করপোরেশনগুলো অধিকাংশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করায় সম্পদ বৈষম্য বাড়ছে।

ফরাসি বিনিয়োগ ব্যাংক ন্যাটিক্সিসের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ আলিসিয়া গার্সিয়া হেরেরো বলেন, তাইওয়ানের বর্তমান অর্থনৈতিক মডেল দেশটিকে একটি “দ্বৈত সমাজে” পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে, যেখানে প্রযুক্তি খাতই অধিকাংশ প্রতিভা, অর্থায়ন ও সুযোগ নিজেদের দিকে টেনে নিচ্ছে।

তিনি বলেন, “বর্তমানে তাইওয়ানে আপনি যদি সেমিকন্ডাক্টর খাতে না থাকেন, তাহলে টিকে থাকা কঠিন।”

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর আরোপিত শুল্কনীতিও তাইওয়ানের ঐতিহ্যবাহী শিল্পখাতকে চাপে ফেলেছে। যদিও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প আংশিক ছাড় পেয়েছে, প্রযুক্তিবহির্ভূত রপ্তানিকারকরা বাড়তি শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

তাইওয়ানে বেতন বাড়লেও তা অসমভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রকৃত গড় মজুরি বেড়েছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ এখনো জাতীয় গড় আয়ের নিচে আয় করেন। প্রযুক্তি খাতে বেতন জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় সামগ্রিক হিসাবেও বৈষম্য বাড়ছে।

অন্যদিকে এআই বুমের কারণে তাইওয়ানের শেয়ারবাজারে ব্যাপক উত্থান হয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তাইওয়ান স্টক এক্সচেঞ্জের বাজারমূল্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

তবু সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কমছে না। গবেষণা প্রতিষ্ঠান একাডেমিয়া সিনিকার গবেষক ওয়েই-টিং ইয়েন বলেন, আবাসন খরচ ও জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়ায় অনেক মানুষ আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। সম্প্রতি পরিচালিত এক জরিপে ৪০ শতাংশ তাইওয়ানি জানিয়েছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি তাদের পরিবারকে আর্থিকভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি ও এআই খাতের দ্রুত উত্থান তাইওয়ানকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করলেও, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে দেশটিতে অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক চাপ ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন