বুধবার, ৬ মে ২০২৬

হরমুজ সংকটে নড়বড়ে পেট্রোডলার ব্যবস্থা, বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি ও অর্থনীতির শক্তির মানচিত্র

একসময় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি সহজ সূত্র ছিল—মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল বের হবে, আর সেই তেলের বিনিময়ে পাওয়া ডলার ফিরে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থায়। কয়েক দশক ধরে এই ব্যবস্থাই বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রীয় কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং বিকল্প মুদ্রায় জ্বালানি লেনদেনের প্রবণতা সেই দীর্ঘস্থায়ী ভারসাম্যকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে জ্বালানি, ভূরাজনীতি ও মুদ্রাব্যবস্থা একে অপরের সঙ্গে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি—যে পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবাহিত হয়।

পেট্রোডলার ব্যবস্থার জন্ম

বর্তমান পেট্রোডলার ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে ১৯৭০-এর দশকে। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে তেল রপ্তানি সীমিত করে দেয় আরব দেশগুলো। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র উপলব্ধি করে যে মধ্যপ্রাচ্যের তেল শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এটি একটি শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক অস্ত্রও।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব-এর মধ্যে একটি কৌশলগত সমঝোতা গড়ে ওঠে। সমঝোতা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি হবে মার্কিন ডলারে এবং তেল রপ্তানিকারী দেশগুলো তাদের অর্জিত ডলার মার্কিন ব্যাংক ও ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

এই ব্যবস্থাই পরবর্তীতে “পেট্রোডলার সিস্টেম” নামে পরিচিতি পায়। এর ফলে ডলার শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা থাকেনি, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।

হরমুজে নতুন বাস্তবতা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর যৌথ সামরিক অভিযানের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালির ওপর আংশিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু জাহাজকে প্রণালি অতিক্রম করতে বিশেষ ‘নিরাপত্তা ফি’ দিতে হয়েছে এবং সেই অর্থের একটি অংশ ডলারের পরিবর্তে চীনা ইউয়ান ও ডিজিটাল মুদ্রায় পরিশোধ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই মূল পরিবর্তনের সূচনা। কারণ বৈশ্বিক তেলবাজারে এতদিন ডলার ছিল অপরিহার্য। কিন্তু যদি জাহাজ চলাচল, নিরাপত্তা বা তেল লেনদেনে বিকল্প মুদ্রা কার্যকরভাবে ব্যবহার শুরু হয়, তাহলে পেট্রোডলারের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া অবস্থান দুর্বল হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু ট্যাংকারকে ইউয়ানে অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এমনকি ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেনের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। এতে ডলারনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার বাইরে সমান্তরাল বাণিজ্য কাঠামো তৈরির ইঙ্গিত দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা।

ভূরাজনীতি এখন তেলবাজারের কেন্দ্র

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব জ্বালানি বাজার এখন শুধু সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করছে না। বরং রাজনৈতিক অবস্থান, জোটভুক্তি, নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ব্রিকস জোটভুক্ত দেশগুলো তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ তারা বিকল্প মুদ্রা ও লেনদেনব্যবস্থা ব্যবহারে বেশি আগ্রহী। অন্যদিকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলোও ডলারের বাইরে বাণিজ্য বাড়ানোর পথ খুঁজছে।

জিওপলিটিক্যাল বিজনেস ইনকের প্রতিষ্ঠাতা আবিশুর প্রকাশের মতে, “ডি-ডলারাইজেশন এখন আর কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি বাস্তব অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় রূপ নিচ্ছে।”

তেলবাজারে সমান্তরাল ধারা

বিশ্লেষকদের মতে, এখন বিশ্বে একক তেলবাজারের বদলে সমান্তরাল বাজার তৈরি হচ্ছে। একদিকে ডলারভিত্তিক প্রচলিত বাজার, অন্যদিকে বিকল্প মুদ্রায় পরিচালিত নিষেধাজ্ঞাবহির্ভূত বাজার।

এফএক্সইএমের গবেষক আবদেল আজিজ আলবোগদাদি বলেছেন, “বাজার এখন একমুখী নয়। কিছু তেল ডলারে বিক্রি হচ্ছে, আবার কিছু তেল ইউয়ান বা অন্যান্য মুদ্রায় লেনদেন হচ্ছে।”

এতে দামের পার্থক্যও তৈরি হচ্ছে। একই ধরনের জ্বালানি ভিন্ন মুদ্রা, ভিন্ন পরিবহন ঝুঁকি ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে।

তবুও ডলার এখনো শক্তিশালী

তবে ডলারের পতন এখনই ঘটছে—এমনটা মনে করছেন না অধিকাংশ বিশ্লেষক। বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা এখনো ডলার ও মার্কিন ট্রেজারি বন্ডকেই নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যেও ডলারের চাহিদা বেড়েছে। কারণ বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার গভীরতা, তারল্য ও আস্থার দিক থেকে এখনো ডলারের পূর্ণ বিকল্প তৈরি হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রিকস-এর যৌথ মুদ্রা চালুর আলোচনা থাকলেও বাস্তবে সেটি কার্যকর করতে দীর্ঘ সময় লাগবে। এর জন্য গভীর অর্থনৈতিক সমন্বয় প্রয়োজন, যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

ওপেকে ভাঙনের ইঙ্গিত

এই পরিবর্তনের মধ্যেই নতুন আরেকটি ঘটনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে নাড়া দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্প্রতি ওপেক ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু উৎপাদন কোটা নিয়ে মতবিরোধ নয়; বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও বহুমুখী বাণিজ্যনীতির দিকেও ইঙ্গিত করছে। ভবিষ্যতে তারা আরও বৈচিত্র্যময় মুদ্রা ব্যবস্থায় ঝুঁকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা?

বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তবতা এখনো ডলারকেন্দ্রিক। কিন্তু প্রতিটি বিকল্প লেনদেন, প্রতিটি ইউয়ানভিত্তিক চুক্তি এবং প্রতিটি ডলারবহির্ভূত তেলবাণিজ্য ভবিষ্যতের নতুন কাঠামোকে আরও দৃশ্যমান করছে।

বিশ্লেষকদের ভাষায়, পেট্রোডলার ব্যবস্থা রাতারাতি ভেঙে পড়বে না। তবে এটি আর আগের মতো অটুট ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়। হরমুজ সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, ভূরাজনীতি এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়—মুদ্রা, জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থারও নিয়ন্ত্রক শক্তি হয়ে উঠছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন