শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

হাশরের ময়দানে মানুষের আটটি ভয়াবহ আফসোস: পবিত্র কুরআনের আলোকে

ইসলাম ও জীবন | বিশেষ প্রবন্ধ

পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী। মানুষের ক্ষমতা, সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং পার্থিব সফলতা একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের বিশ্বাস, কর্ম, সিদ্ধান্ত এবং জীবন পরিচালনার পদ্ধতির হিসাব শেষ হয়ে যাবে না। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত্যুর পর প্রত্যেক মানুষকে পুনরুত্থিত করা হবে এবং মহান আল্লাহর সামনে তার পার্থিব জীবনের কর্মের হিসাব দিতে হবে।

সেদিন এমন অনেক সত্য মানুষের সামনে প্রকাশিত হবে, যা পৃথিবীতে অবস্থানকালে সে অবহেলা করেছে কিংবা অস্বীকার করেছে। দুনিয়ায় যেসব সম্পর্ককে সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিল, যেসব নেতৃত্বকে অনুসরণ করেছিল এবং যেসব কাজকে নিজের সাফল্যের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিল, সেগুলোর প্রকৃত পরিণতি তার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

কুরআন মাজীদে বিচার দিবসের এমন কিছু অনুশোচনার কথা উল্লেখ রয়েছে, যা মানুষকে দুনিয়ার জীবনেই সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানায়। সেদিন কেউ ভুল বন্ধুত্বের জন্য অনুতপ্ত হবে, কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতার জন্য আফসোস করবে, কেউ নিজের আমলনামা দেখে আতঙ্কিত হবে, আবার কেউ পৃথিবীতে ফিরে এসে নতুনভাবে জীবন শুরু করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করবে।

কিন্তু তখন আর পৃথিবীতে ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না।

পবিত্র কুরআনের আলোকে হাশরের ময়দানে মানুষের এমন আটটি ভয়াবহ আফসোস এবং সেগুলো থেকে আমাদের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো।

এক. ভুল বন্ধু নির্বাচনের জন্য আফসোস

মানুষের জীবনে বন্ধুত্বের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। একজন সৎ বন্ধু মানুষকে সত্য, ন্যায়, কল্যাণ ও আল্লাহর আনুগত্যের পথে উৎসাহিত করতে পারে। বিপরীতে অসৎ সঙ্গ মানুষকে ধীরে ধীরে অন্যায়, পাপাচার এবং সত্যবিমুখতার দিকে পরিচালিত করতে পারে।

পবিত্র কুরআনে বিচার দিবসে অন্যায়কারীর অনুশোচনার একটি হৃদয়বিদারক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“হায়, আমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি অমুক ব্যক্তিকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে-ই আমাকে তা থেকে বিচ্যুত করেছিল। আর শয়তান মানুষের জন্য মহাপ্রতারক।”

—সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ২৮–২৯ (ভাবানুবাদ)।

এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, পৃথিবীতে মানুষের সঙ্গ নির্বাচন শুধু সামাজিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এর সঙ্গে তার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

যে বন্ধু মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, অন্যায়কে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করে এবং সত্যের পরিবর্তে প্রবৃত্তির অনুসরণে উৎসাহিত করে, সেই বন্ধুত্ব পরকালে অনুশোচনার কারণ হতে পারে।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—

“নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু; অতএব তোমরাও তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করো। সে তার অনুসারীদের আহ্বান করে, যাতে তারা জ্বলন্ত আগুনের অধিবাসী হয়।”

—সূরা ফাতির, আয়াত ৬ (ভাবানুবাদ)।

শয়তানের প্রধান কৌশল হলো মানুষের সামনে অন্যায়কে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা এবং সত্যের পথকে কঠিন কিংবা অপ্রয়োজনীয় বলে প্রতীয়মান করা।

সূরা আল-ইসরার ৬১–৬৫ নম্বর আয়াতে আদম (আ.)-কে সিজদা করতে ইবলিসের অস্বীকৃতি, মানবজাতিকে বিভ্রান্ত করার তার সংকল্প এবং শয়তানের প্রতারণামূলক প্রতিশ্রুতির কথা বর্ণিত হয়েছে।

তবে আল্লাহর নিষ্ঠাবান বান্দাদের ওপর শয়তানের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব নেই—এ কথাও সেখানে স্পষ্ট করা হয়েছে।

অতএব, একজন মুমিনের কর্তব্য হলো বন্ধুত্ব ও সঙ্গ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা। কারণ পৃথিবীতে যে সঙ্গ আনন্দের মনে হয়, তা যদি মানুষকে সত্য থেকে বিচ্যুত করে, তাহলে পরকালে সেটিই গভীর অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

দুই. নেককারদের পথ অনুসরণ না করার আফসোস

মানুষ সাধারণত জীবনে সফল ব্যক্তিদের অনুসরণ করতে চায়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত সফলতা শুধু সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

প্রকৃত সফলতা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরকালে তাঁর অনুগ্রহ লাভ করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“যারা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করবে, তারা তাদের সঙ্গী হবে, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন—নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের। আর সঙ্গী হিসেবে তারা কতই না উত্তম!”

—সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬৯ (ভাবানুবাদ)।

এই আয়াতে মানুষের জন্য সর্বোত্তম অনুসরণীয় ব্যক্তিদের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।

যারা সত্য ও ন্যায়ের পথে জীবন পরিচালনা করেন, আল্লাহর বিধান মেনে চলেন এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করেন, তাদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করা মুমিনের জন্য কল্যাণকর।

অন্যদিকে সূরা আন-নিসার ৭২–৭৩ নম্বর আয়াতে এমন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যে সংগ্রামে অংশগ্রহণ না করে অন্যদের সাফল্য দেখে আক্ষেপ প্রকাশ করে।

তার বক্তব্যের অর্থ—

“হায়, আমি যদি তাদের সঙ্গে থাকতাম, তাহলে বিরাট সাফল্য লাভ করতাম!”

—সূরা আন-নিসা, আয়াত ৭৩-এর অংশবিশেষ (ভাবানুবাদ)।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন: আয়াতটির প্রত্যক্ষ প্রেক্ষাপট হলো আল্লাহর পথে সংগ্রামে অংশগ্রহণ থেকে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তির পার্থিব লাভের আকাঙ্ক্ষা। এটি সরাসরি হাশরের ময়দানে উচ্চারিত অনুশোচনার বর্ণনা নয়।

তবে আয়াতটির আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। মানুষ অনেক সময় কল্যাণকর কাজের সুযোগ পেয়েও তা গ্রহণ করে না। পরবর্তী সময়ে অন্যদের সাফল্য দেখে আফসোস করে।

সুতরাং নেককারদের অনুসরণ, সৎকর্মে অংশগ্রহণ এবং আল্লাহর আনুগত্যের সুযোগ পৃথিবীতেই কাজে লাগাতে হবে।

তিন. নিজের মন্দকর্ম থেকে দূরে থাকার আকাঙ্ক্ষা

মানুষ পৃথিবীতে অনেক কাজ করে, যার পরিণতি সম্পর্কে সে যথেষ্ট চিন্তা করে না।

ক্ষমতার অপব্যবহার, অন্যের অধিকার হরণ, প্রতারণা, অহংকার, জুলুম এবং গোপনে সংঘটিত অন্যায়—এসব কাজ সাময়িকভাবে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকতে পারে। কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো কাজই গোপন থাকে না।

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—

“যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃত ভালো কাজ এবং মন্দ কাজ সামনে উপস্থিত পাবে, সেদিন সে কামনা করবে, যদি তার ও সেই মন্দকর্মের মধ্যে বহু দূরত্ব থাকত!”

—সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৩০ (ভাবানুবাদ)।

এই আয়াত মানুষকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

পৃথিবীতে মানুষ নিজের ভুল গোপন করতে পারে, অন্যের কাছে নিজেকে নির্দোষ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে, এমনকি অন্যায়কে ন্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু বিচার দিবসে মানুষের কৃতকর্ম তার সামনে উপস্থিত করা হবে।

সেদিন সে নিজের মন্দকর্ম থেকে দূরে থাকতে চাইবে।

কিন্তু যে কাজ ইতোমধ্যে সংঘটিত হয়েছে এবং যার হিসাব আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ থাকবে না।

এই আয়াতের শিক্ষা হলো, কোনো কাজ করার আগে তার নৈতিকতা ও পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে মানুষের অধিকার, আমানত, দায়িত্ব এবং অন্যের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।

চার. ‘হায়, আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম!’

পবিত্র কুরআনে বিচার দিবসের এমন এক ভয়াবহ অনুশোচনার কথা উল্লেখ রয়েছে, যখন অবিশ্বাসী ব্যক্তি নিজের অস্তিত্ব নিয়েই আফসোস করবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“নিশ্চয়ই আমি তোমাদের আসন্ন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেছি। সেদিন মানুষ নিজের কৃতকর্ম দেখতে পাবে এবং অবিশ্বাসী বলবে, হায়, আমি যদি মাটি হতাম!”

—সূরা আন-নাবা, আয়াত ৪০ (ভাবানুবাদ)।

এই বক্তব্য বিচার দিবসের অসহায়ত্ব ও অনুশোচনার গভীরতা প্রকাশ করে।

পৃথিবীতে মানুষ নিজের পরিচয়, মর্যাদা, সম্পদ ও ক্ষমতা নিয়ে গর্ব করতে পারে। কিন্তু পরকালের বিচারের সামনে এসব পার্থিব পরিচয় তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্তি দিতে পারবে না।

যে ব্যক্তি সত্য অস্বীকার করেছে এবং নিজের কর্মের পরিণতি সম্পর্কে উদাসীন থেকেছে, সে সেদিন এমন অবস্থায় পৌঁছাবে যে মাটি হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করবে।

এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা শুধু পার্থিব অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না; বরং আল্লাহর কাছে তার বিশ্বাস, আন্তরিকতা ও কর্মের মূল্যায়নই চূড়ান্ত।

পাঁচ. পরকালের জন্য প্রস্তুতি না নেওয়ার আফসোস

মানুষ ভবিষ্যতের জন্য নানা পরিকল্পনা করে।

সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের নিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সম্পদ বৃদ্ধি এবং বার্ধক্যের প্রস্তুতি নিয়ে তার চিন্তার শেষ নেই।

কিন্তু এই দীর্ঘ পরিকল্পনার মধ্যে অনেক সময় মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতি উপেক্ষিত থেকে যায়।

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—

“সেদিন মানুষ উপদেশ গ্রহণ করবে; কিন্তু তখন সেই উপদেশ তার কী কাজে আসবে? সে বলবে, হায়, আমি যদি আমার এই জীবনের জন্য কিছু অগ্রিম পাঠাতাম!”

—সূরা আল-ফাজর, আয়াত ২৩–২৪ (ভাবানুবাদ)।

এখানে মানুষের সবচেয়ে বড় অনুশোচনাগুলোর একটি তুলে ধরা হয়েছে।

পৃথিবীতে অবস্থানকালে সে সৎকর্মের সুযোগ পেয়েছিল, অন্যায় থেকে ফিরে আসতে পারত, মানুষের অধিকার আদায় করতে পারত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারত।

কিন্তু সে সুযোগগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগায়নি।

পরকালে গিয়ে যখন সে নিজের কর্মের প্রকৃত পরিণতি উপলব্ধি করবে, তখন অনুশোচনা করলেও পৃথিবীতে ফিরে এসে নতুনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে না।

ইসলাম মানুষকে শুধু মৃত্যুর কথা স্মরণ করতে বলে না; বরং মৃত্যুর আগেই দায়িত্বশীল জীবনযাপনের নির্দেশ দেয়।

নামাজ, রোজা, জাকাত, দান-সদকা, সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে একজন মুমিন পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে তওবা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ ভুল করতেই পারে; কিন্তু ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা এবং নিজের আচরণ সংশোধন করাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

ছয়. আমলনামা হাতে পেয়ে চরম অনুশোচনা

বিচার দিবসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো মানুষের আমলনামা প্রদান।

পৃথিবীতে মানুষ যা করেছে, তার হিসাব আল্লাহর নির্দেশে সংরক্ষিত রয়েছে। বিচার দিবসে সেই হিসাব তার সামনে উপস্থাপিত হবে।

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—

“আর যার আমলনামা তার বাঁ হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, হায়, আমাকে যদি আমার আমলনামা দেওয়া না হতো!”

—সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত ২৫ (ভাবানুবাদ)।

পরবর্তী আয়াতগুলোতে তার অনুশোচনার আরও বর্ণনা রয়েছে।

সে কামনা করবে, যদি নিজের হিসাব সম্পর্কে কিছুই জানতে না হতো। সে উপলব্ধি করবে, তার সম্পদ কিংবা পার্থিব ক্ষমতা তাকে রক্ষা করতে পারেনি।

অন্যদিকে সূরা আল-ইনশিকাকের ১০–১২ নম্বর আয়াতে পেছন দিক থেকে আমলনামা প্রাপ্ত ব্যক্তির করুণ পরিণতির কথা উল্লেখ রয়েছে।

এই আয়াতগুলো মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীতে প্রতিটি কাজের গুরুত্ব রয়েছে।

কোনো অন্যায় মানুষের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে, কোনো প্রতারণা সাময়িকভাবে সফল হতে পারে এবং কোনো অপরাধের বিচার পৃথিবীতে নাও হতে পারে। কিন্তু আল্লাহর বিচারে কোনো কাজই উপেক্ষিত থাকবে না।

সুতরাং মানুষের উচিত নিজের দৈনন্দিন কাজের হিসাব নিজেই পর্যালোচনা করা।

কারও অধিকার নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দেওয়া, অন্যায় করলে সংশোধন করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা প্রয়োজন।

কারণ পৃথিবীতে আত্মসমালোচনা ও সংশোধনের সুযোগ রয়েছে; কিন্তু পরকালের হিসাবের দিন সেই সুযোগ আর থাকবে না।

সাত. আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য না করার আফসোস

মানুষের জীবনে নেতৃত্ব ও অনুসরণের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মানুষ অন্যের নির্দেশনা ও নেতৃত্ব অনুসরণ করে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, কোনো মানুষের আনুগত্য আল্লাহর বিধানের পরিপন্থী হতে পারে না।

পবিত্র কুরআনে জাহান্নামের অধিবাসীদের অনুশোচনা সম্পর্কে বলা হয়েছে—

“যেদিন তাদের মুখমণ্ডল আগুনে ওলট-পালট করা হবে, সেদিন তারা বলবে, হায়, আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম এবং রাসুলের আনুগত্য করতাম!”

—সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৬৬ (ভাবানুবাদ)।

এর পরবর্তী আয়াতে তারা নিজেদের পথভ্রষ্টতার জন্য অনুসৃত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করবে।

“হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের আনুগত্য করেছিলাম; তারা আমাদের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করেছে।”

—সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৬৭ (ভাবানুবাদ)।

এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, অন্ধ আনুগত্য মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

কোনো ব্যক্তি সমাজে প্রভাবশালী, জনপ্রিয় কিংবা ক্ষমতাবান হলেই তার সব বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড অনুসরণযোগ্য হয়ে যায় না।

একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করা এবং অন্যায় কাজে সহযোগিতা থেকে বিরত থাকা।

পবিত্র কুরআনে আরও বলা হয়েছে—

“সেদিন বন্ধুরা একে অপরের শত্রু হয়ে যাবে, তবে মুত্তাকিরা ছাড়া।”

—সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত ৬৭ (ভাবানুবাদ)।

অর্থাৎ যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আল্লাহভীতি এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, তার মর্যাদা আলাদা। পক্ষান্তরে অন্যায়, জুলুম ও পাপাচারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক পরকালে পারস্পরিক দোষারোপ ও শত্রুতার কারণ হতে পারে।

একইভাবে সূরা আল-ফুরকানের ২৭ নম্বর আয়াতে অন্যায়কারীর আরেকটি অনুশোচনা উল্লেখ রয়েছে—

“হায়, আমি যদি রাসুলের সঙ্গে পথ অবলম্বন করতাম!”

এই আয়াতের মূল শিক্ষা হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রদর্শিত সত্য ও ন্যায়ের পথ অনুসরণ করা এবং তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।

আট. পৃথিবীতে ফিরে আসার আকুতি

বিচার দিবসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অনুশোচনাগুলোর একটি হলো পৃথিবীতে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা।

মানুষ যখন নিজের কৃতকর্মের পরিণতি প্রত্যক্ষ করবে, তখন অনেকেই নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ চাইবে।

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—

“তুমি যদি দেখতে, যখন তাদের আগুনের সামনে দাঁড় করানো হবে, তখন তারা বলবে, হায়, যদি আমাদের আবার ফিরিয়ে দেওয়া হতো! তাহলে আমরা আমাদের রবের নিদর্শনগুলো অস্বীকার করতাম না এবং মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।”

—সূরা আল-আনআম, আয়াত ২৭ (ভাবানুবাদ)।

এটি মানুষের গভীর অনুশোচনার এক মর্মস্পর্শী বর্ণনা।

পৃথিবীতে অবস্থানকালে যেসব সত্যকে সে অস্বীকার করেছিল, যেসব উপদেশকে অবহেলা করেছিল এবং যেসব দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল, সেগুলোর গুরুত্ব তখন তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

কিন্তু পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন, তাদের আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও তারা নিষিদ্ধ কাজের দিকেই ফিরে যেত।

—সূরা আল-আনআম, আয়াত ২৮-এর মর্মার্থ।

এই বক্তব্য মানুষের স্বভাব সম্পর্কে গভীর শিক্ষা দেয়।

শুধু বিপদের মুখে অনুশোচনা প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; বরং আন্তরিকভাবে সত্য গ্রহণ করা এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিবর্তন করা প্রয়োজন।

পৃথিবীর জীবনই মানুষের জন্য পরীক্ষা, সংশোধন, তওবা ও সৎকর্মের সুযোগ।

মৃত্যুর পর যখন বিচারের পর্ব শুরু হবে, তখন নতুন করে পৃথিবীতে ফিরে এসে সেই সুযোগ গ্রহণ করা সম্ভব হবে না।

হাশরের অনুশোচনা থেকে আমাদের শিক্ষা

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত এসব অনুশোচনা শুধু ভবিষ্যতের কোনো ঘটনার বিবরণ নয়; বরং বর্তমান জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

মানুষকে মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের নৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।

সে কাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করছে, কার নেতৃত্ব অনুসরণ করছে, কীভাবে সম্পদ অর্জন করছে, মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করছে এবং আল্লাহর নির্দেশনার প্রতি কতটা দায়িত্বশীল থাকছে—এসব বিষয় তার জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে।

একজন মানুষ পৃথিবীতে সাময়িকভাবে অন্যায় করে লাভবান হতে পারে। কিন্তু পার্থিব লাভই প্রকৃত সফলতার একমাত্র মানদণ্ড নয়।

একইভাবে কেউ ন্যায় ও সত্যের পথে চলতে গিয়ে কষ্টের সম্মুখীন হলেও আল্লাহর কাছে তার সেই প্রচেষ্টা মূল্যহীন নয়।

কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী, মানুষের উচিত নিজের জীবনকে নিয়মিত পর্যালোচনা করা এবং ভুল বুঝতে পারলে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া।

বিশেষ করে পাঁচটি বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন—ঈমান ও আল্লাহর আনুগত্য, সৎ সঙ্গ নির্বাচন, মানুষের অধিকার রক্ষা, অন্যায় থেকে তওবা এবং পরকালের জন্য সৎকর্মের প্রস্তুতি।

অনুশোচনার আগেই ফিরে আসার আহ্বান

ইসলাম মানুষের সামনে শুধু শাস্তির ভয় তুলে ধরে না; বরং আল্লাহর রহমত, ক্ষমা এবং সংশোধনের আশাও জাগ্রত করে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

“বলুন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”

—সূরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩ (ভাবানুবাদ)।

এই আয়াত মানুষের জন্য অসীম আশার বার্তা বহন করে।

অতীতে কেউ যত ভুলই করে থাকুক না কেন, জীবিত অবস্থায় আন্তরিক তওবা, অন্যায় পরিত্যাগ এবং সংশোধনের মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ রয়েছে। তবে অন্যের অধিকার নষ্ট করে থাকলে সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া বা যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করাও জরুরি।

মানুষের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য হলো, সে এখনো নিজের ভুল সংশোধন করার সুযোগ পাচ্ছে।

আজ যে ব্যক্তি সত্য গ্রহণ করবে, অন্যায় থেকে ফিরে আসবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন পরিচালনা করবে, সে পরকালের অনুশোচনা থেকে মুক্তির আশা করতে পারে।

উপসংহার

হাশরের ময়দানে মানুষের অনুশোচনার যে চিত্র পবিত্র কুরআনে তুলে ধরা হয়েছে, তা প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষের জন্য গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।

সেদিন কেউ বলবে, ভুল মানুষকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করলেই ভালো হতো। কেউ কামনা করবে, নিজের মন্দকর্ম থেকে যদি দূরে থাকতে পারত। কেউ বলবে, পরকালের জন্য যদি কিছু প্রস্তুতি গ্রহণ করতাম। আবার কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য না করার জন্য অনুতপ্ত হবে এবং পৃথিবীতে ফিরে আসার সুযোগ চাইবে।

কিন্তু বিচার দিবসের সেই অনুশোচনা পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া সময় ফিরিয়ে আনবে না।

তাই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা হলো, অনুশোচনার দিন আসার আগেই নিজের জীবনকে সংশোধন করা।

আজই সময় ভুল পথ থেকে ফিরে আসার, সৎকর্মে অগ্রসর হওয়ার, অন্যের অধিকার রক্ষা করার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করার।

কারণ পৃথিবী হলো আমল করার সুযোগের স্থান, আর আখিরাত হলো সেই আমলের হিসাব ও প্রতিদানের স্থান।

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করুন, শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করুন এবং বিচার দিবসের অনুশোচনা থেকে মুক্তি দান করুন। আমিন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন