অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডএবল আইফোন ঘিরে ক্রেতাদের ব্যাপক আগ্রহ; বিশ্লেষকদের ধারণা, বিক্রির সংখ্যার চেয়ে আয় বাড়ানো ও বিলাসবহুল ফোনের বাজারে আধিপত্য বিস্তারই বড় লক্ষ্য
আগাম বিক্রি শুরুর প্রথম দিনেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডএবল স্মার্টফোন আইফোন ডুও। ঘোষণার পরপরই দোকান থেকে সরাসরি বিতরণের জন্য বরাদ্দ স্টক শেষ হয়ে গেছে। এখন অনলাইনে অর্ডার করলে গ্রাহকদের ফোন হাতে পেতে আগামী বছরের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
অ্যাপল এই প্রি-অর্ডারের সাড়াকে ‘অসাধারণের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়’ বলে বর্ণনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, নতুন ফোনটি যত দ্রুত সম্ভব গ্রাহকদের হাতে পৌঁছে দিতে কাজ চলছে এবং অনলাইনে অর্ডার নেওয়া অব্যাহত থাকবে।
অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডএবল আইফোনের প্রাথমিক সংস্করণের দাম ১ হাজার ৯৯৯ ডলার। আর ২ টেরাবাইট স্টোরেজের সংস্করণটির দাম ৩ হাজার ডলারেরও বেশি। আইফোনের নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা এই ডিভাইস অ্যাপলের ‘প্রো’ ও ‘প্রো ম্যাক্স’ মডেলের চেয়েও উচ্চমূল্যের নতুন একটি বাজার তৈরি করছে।
বিক্রির চেয়ে আয়ে বেশি গুরুত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, ফোল্ডএবল ফোনকে রাতারাতি গণমানুষের পণ্যে পরিণত করা অ্যাপলের প্রধান লক্ষ্য নয়। বরং প্রতিষ্ঠানটি তাদের সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে সক্ষম গ্রাহকদের কাছ থেকে আয় বাড়াতে চায়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বজুড়ে মোট স্মার্টফোন বিক্রির মাত্র ২ শতাংশ হতে পারে ফোল্ডএবল ফোন। তবে স্মার্টফোন খাতের মোট আয়ের প্রায় ৭ শতাংশ আসতে পারে এই বিভাগ থেকে। ২০৩০ সালের মধ্যে ফোল্ডএবল ফোনের হিস্যা মোট রাজস্বের ১০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যদিও বিক্রির সংখ্যায় এর অংশ থাকবে মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি।
বিক্রির সংখ্যা ও আয়ের এই ব্যবধানকে অ্যাপলের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। আইডিসির বিশ্ব গবেষণা পরিচালক নাবিলা পোপাল বলেছেন, ডুও দ্রুতই বহুল কাঙ্ক্ষিত একটি বিলাসবহুল ফোল্ডএবল ফোনে পরিণত হচ্ছে।
তার মতে, ফোল্ডএবল প্রযুক্তি একেবারে নতুন নয়। অ্যান্ড্রয়েড নির্মাতারা বেশ কয়েক বছর ধরেই এ ধরনের ফোন বাজারে বিক্রি করছে। নতুনত্ব হলো, অ্যাপল তাদের বড় ও অনুগত গ্রাহকগোষ্ঠীর কাছে এই নকশা নিয়ে এসেছে।
প্রত্যাশার তুলনায় দাম কম
অ্যাপল এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ফোল্ডএবল প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। ২০১১ সালেই প্রতিষ্ঠানটির ছয়জন প্রকৌশলী এ প্রযুক্তিসংক্রান্ত একটি পেটেন্টের আবেদন করেছিলেন।
শিল্প খাতের অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণার তুলনায় আইফোন ডুওর প্রারম্ভিক দাম কিছুটা কম। প্রযুক্তি বিশ্লেষক আনশেল সেগ বলেছেন, অনেকেই ফোল্ডএবল আইফোনের দাম ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ ডলারের মধ্যে শুরু হবে বলে ধারণা করেছিলেন।
সেখানে ১ হাজার ৯৯৯ ডলারে দাম নির্ধারণের মধ্য দিয়ে অ্যাপল ফোল্ডএবল ফোনের বাজারের বড় অংশ দখলের লক্ষ্য দেখাচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি। সেগের ধারণা, বড়দিনের উৎসবের মৌসুম ও আগামী বছরজুড়ে ডুও একটি বিশেষ ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ হয়ে উঠতে পারে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের পরিচালক তরুন পাঠাকের মতে, শুরুতে সরবরাহ করা ফোনের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় কম থাকবে।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪০ কোটি সক্রিয় আইফোন ব্যবহারকারী রয়েছেন। তাদের সামান্য একটি অংশও নতুন ফোনটি কিনতে আগ্রহী হলে প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ প্রায় ৬০ লাখ বা তার চেয়ে কম ইউনিট দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে।
আইডিসির ধারণা, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং অ্যাপলের নিজস্ব মান বজায় রাখার কারণে শুরুতে সরবরাহ সীমিত থাকবে। চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ ফোনটির প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফোল্ডএবল বাজারে শীর্ষে ওঠার সম্ভাবনা
আইডিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর অ্যাপল প্রায় ৭০ লাখ ইউনিট আইফোন ডুও সরবরাহ করতে পারে। এ সংখ্যা ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির মোট আইফোন সরবরাহের প্রায় ৩ শতাংশ।
তবে নাবিলা পোপালের পূর্বাভাস, আগামী বছর ডুওর সরবরাহ প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়তে পারে। এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে স্যামসাং ও হুয়াওয়েকে পেছনে ফেলে ফোল্ডএবল ফোনের বিশ্ববাজারে প্রায় ৪০ শতাংশ হিস্যা নিয়ে শীর্ষস্থান দখল করতে পারে অ্যাপল।
তবে অ্যাপলের কাছে শুধু বিক্রির সংখ্যা নয়, প্রতি ফোন থেকে কত আয় হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, ডুওর সম্ভাব্য ক্রেতাদের একটি বড় অংশই পুরোনো আইফোন ব্যবহারকারী। তারা আগে ‘প্রো ম্যাক্স’ মডেল কিনতেন, এখন আরও কয়েকশ ডলার খরচ করে উন্নত ও দামি ফোল্ডএবল ফোনে যেতে পারেন।
আবার কেউ কেউ নিয়মিত আইফোনের পাশাপাশি দ্বিতীয় স্মার্টফোন হিসেবেও ডুও কিনতে পারেন। অ্যাপলের নিজস্ব প্রযুক্তি ও পণ্যসম্ভারের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকায় একই ইকোসিস্টেমে দুটি ফোন ব্যবহার করা তাদের জন্য সহজ হতে পারে।
পোপালের মতে, প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলারের প্রিমিয়াম আইফোন থেকে প্রায় ২ হাজার ডলারের ডিভাইসে গ্রাহকদের স্থানান্তর ঘটলে মোট ফোন সরবরাহের সংখ্যা খুব বেশি না বাড়লেও অ্যাপলের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যানও একই ধরনের সম্ভাবনার কথা বলেছে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী বছর সামগ্রিক আইফোন বিক্রি একই পর্যায়ে থাকলেও ডুওর উচ্চ গড় বিক্রয়মূল্য কোম্পানির মোট আয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আইফোনের আয় বাড়ানোর নতুন কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, অ্যাপলের পরবর্তী আইফোন ১৮ পণ্যচক্রে বিক্রির সংখ্যার চেয়ে পণ্যের বৈচিত্র্য ও উচ্চমূল্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। ডি এ ডেভিডসনের বিশ্লেষক গিল লুরি বলেছেন, আইফোনের শক্তিশালী আপগ্রেড চক্রের জন্য ডুওর সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ। এই ডিভাইস থেকে বাড়তি প্রবৃদ্ধি না এলে অ্যাপলের রাজস্ব বৃদ্ধির গতি মন্থর হতে পারে।
লুরির মতে, ডুও একাধিকভাবে অ্যাপলকে সুবিধা দিতে পারে। এটি কট্টর অ্যাপলভক্তদের আকৃষ্ট করে গড় বিক্রয়মূল্য বাড়াতে পারে। পাশাপাশি, ফোল্ডএবল আইফোন না থাকায় যারা অ্যান্ড্রয়েড ফোনের দিকে ঝুঁকেছিলেন, তাদেরও অ্যাপলের পণ্যসম্ভারে ফিরিয়ে আনতে পারে।
এমনকি যারা শেষ পর্যন্ত ডুও কিনবেন না, তারাও অ্যাপলের বিক্রি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারেন। লুরির ধারণা, অনেক ক্রেতা নতুন ফোনটি দেখতে অ্যাপল স্টোরে যাবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুলনামূলক কম দামের নিয়মিত আইফোন বা আইফোন প্রো কিনে ফিরতে পারেন।
আইফোনকে বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা
বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোনের বাজার যখন ধীরগতির প্রবৃদ্ধির মুখে, তখন অ্যাপল তাদের পণ্যের উচ্চমূল্যের বিভাগ সম্প্রসারণের কৌশল নিয়েছে। ব্যবহারকারীরা আগের তুলনায় বেশি সময় একই ফোন ব্যবহার করছেন। ফলে শুধু বেশি সংখ্যক ফোন বিক্রির মাধ্যমে আয় বাড়ানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
টেকইনসাইটসের বিশ্লেষক ওয়েইন ল্যাম বলেছেন, আইফোনের বয়স প্রায় ২০ বছর হতে চলায় অ্যাপলের জন্য নতুন বাজার তৈরি করা সহজ নয়। এ অবস্থায় উচ্চমূল্যের ফোনের দিকে ঝোঁকা প্রতি প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব ধরে রাখার একটি উপায়।
ল্যাম ডুওকে সাধারণ ফোনের চেয়ে বিলাসবহুল পণ্য হিসেবেই দেখছেন। তবে অ্যাপলের ভিশন পণ্যের বিপরীতে ফোল্ডএবল ফোন ভবিষ্যতে বড় একটি বাজারে পরিণত হতে পারে বলে তার ধারণা। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারকারীদের ডিভাইস ব্যবহারের ধরন বদলে দিলে এ ধরনের ফোনের চাহিদা বাড়তে পারে।
এর আগে অ্যাপল বিলাসবহুল পণ্যের বাজারেও প্রবেশের চেষ্টা করেছে। প্রথম অ্যাপল ওয়াচের ১৮ ক্যারেট সোনার ‘এডিশন’ সংস্করণের দাম শুরু হয়েছিল ১০ হাজার ডলার থেকে। এ ছাড়া ফরাসি ফ্যাশন হাউস ‘এরমেস’-এর সঙ্গে প্রিমিয়াম ওয়াচ ব্যান্ডের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছিল প্রতিষ্ঠানটি।
তৎকালীন রিটেইল প্রধান ও বারবেরির সাবেক প্রধান নির্বাহী অ্যাঞ্জেলা আরেনডসের সময়ে অ্যাপল স্টোরে ফ্যাশন ও বিলাসবহুল পণ্যের আবহ তৈরির যে চেষ্টা শুরু হয়েছিল, আইফোন ডুওর মাধ্যমে সেই কৌশল প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আইফোনেও যুক্ত হচ্ছে।
উচ্চমূল্যই হতে পারে ঝুঁকি
ডুওর প্রাথমিক চাহিদা প্রবল হলেও উচ্চমূল্য ভবিষ্যতে অ্যাপলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দাম বেশি হলে গ্রাহকেরা ফোনটি দীর্ঘদিন ব্যবহার করতে পারেন এবং নতুন মডেলে দ্রুত আপগ্রেড করতে অনাগ্রহী হতে পারেন। এতে দীর্ঘ মেয়াদে নতুন ফোনের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে ওয়েইন ল্যামের ধারণা, প্রাথমিক পর্যায়ে সরবরাহের তুলনায় ডুওর চাহিদা বেশি থাকবে। তার মতে, ভবিষ্যতের প্রিমিয়াম আইফোনের জন্য ডিভাইসটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে আইফোন ডুওর প্রাথমিক সাড়া অ্যাপলের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে ফোনটির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে প্রাথমিক আগ্রহ ধরে রাখা, সরবরাহ বাড়ানো এবং ক্রেতাদের উচ্চমূল্য দিতে রাজি রাখার ওপর।

