বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার পরিদর্শনে ফরাসি সিনেট প্রতিনিধিদল

দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পানি শোধনের সক্ষমতা • উপকৃত হতে পারেন প্রায় ৪৩ লাখ মানুষ • ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ঢাকার নির্ভরতা কমানো প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

ঢাকার ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা মেটাতে নির্মাণাধীন গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগারের অগ্রগতি পরিদর্শন করেছেন ফরাসি সিনেটের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। সফরে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন পরিস্থিতি, প্রধান অবকাঠামো এবং নিরাপদ ও টেকসই পানি সরবরাহে এর সম্ভাব্য ভূমিকা সম্পর্কে প্রতিনিধিদলকে অবহিত করেছে ঢাকা ওয়াসা।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ফরাসি সিনেটর গিয়োম শেভরোলিয়ে, অলিভিয়ের হেনো ও পিয়ের-অ্যালাঁ রোইরোঁ প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এজেন্স ফ্রঁসেজ দ্য ডেভেলপমেন্টের (এএফডি) প্রতিনিধিরা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অমিত দত্ত।

ঢাকা ওয়াসার ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রজেক্ট’-এর আওতায় গন্ধর্বপুরে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন লিটার বা ৫০ কোটি লিটার পানি শোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন প্ল্যান্টটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

মেঘনা থেকে আসবে পানি

প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য ঢাকার পানি সরবরাহে ভূগর্ভস্থ উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো।

গন্ধর্বপুর শোধনাগারের জন্য কাঁচা পানি সংগ্রহ করা হবে মেঘনা নদী থেকে। সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি শোধনাগারে এনে পরিশোধনের পর ঢাকার বিদ্যমান সরবরাহ নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এএফডির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে দৈনিক পাঁচ লাখ ঘনমিটার পানি সরবরাহ করতে পারবে এবং প্রায় ৪৩ লাখ মানুষের পানির চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর লক্ষ্য রয়েছে প্রকল্পটির।

প্রকল্পের আওতায় মেঘনা নদীতে পানি গ্রহণের অবকাঠামো, কাঁচা পানি পরিবহনের পাইপলাইন, গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার, শোধিত পানি পরিবহনের লাইন এবং ঢাকার পানি বিতরণব্যবস্থার বিভিন্ন অংশ শক্তিশালী করার কাজ রয়েছে।

অগ্রগতি দেখলেন ফরাসি সিনেটররা

পরিদর্শনের সময় ঢাকা ওয়াসা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে যুক্ত SUEZ-OTV Veolia JV প্রতিনিধিদলের সামনে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি তুলে ধরে।

উপস্থাপনায় প্রকল্পের কৌশলগত লক্ষ্য, বর্তমান বাস্তবায়ন পরিস্থিতি, এখন পর্যন্ত অর্জন এবং প্রধান অবকাঠামোগত উপাদান সম্পর্কে আলোচনা হয়। পরে প্রতিনিধিদল শোধনাগারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও চলমান নির্মাণকাজ ঘুরে দেখে।

ঢাকা ওয়াসার পক্ষে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (আরপি অ্যান্ড ডি) মো. আজিজুল হক এবং প্রকল্প পরিচালক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ছিলেন।

এর আগে গত জুনে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার পরিদর্শন করে অবশিষ্ট কাজ এক বছরের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সে সময়ও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ফ্রান্সের অর্থায়ন

গন্ধর্বপুর প্রকল্পে ফ্রান্সের উন্নয়ন সংস্থা AFD গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়নকারী অংশীদার। AFD-এর বর্তমান প্রকল্প তথ্যে গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগারের জন্য তাদের অর্থায়নের পরিমাণ ১৭৭ মিলিয়ন ইউরো দেখানো হয়েছে। এডিবির প্রকল্প তথ্যে AFD-এর সহ-অর্থায়নের একটি অংশ ১৪১.৫০ মিলিয়ন ডলার হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। ফলে সফরসংক্রান্ত বিবৃতিতে উল্লেখিত ২০৫.৪৫ মিলিয়ন ডলারকে সরাসরি AFD-এর বর্তমান মোট অর্থায়ন হিসেবে না দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট বিবৃতির তথ্য হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এ প্রকল্পে AFD-এর পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (EIB) এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন রয়েছে।

ফরাসি প্রতিনিধিদল সফরের সময় বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে ফ্রান্সের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা তুলে ধরে। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরীর বাসিন্দাদের জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে দুই দেশের সহযোগিতার গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়।

ঢাকার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

ঢাকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর উচ্চ নির্ভরতা রয়েছে। অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ভবিষ্যতের পানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

AFD-এর প্রকল্প তথ্যে বলা হয়েছে, ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বছরে প্রায় দুই থেকে তিন মিটার পর্যন্ত নিচে নামছে। এ বাস্তবতায় মেঘনা নদীর মতো ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে পানি এনে শোধনের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানোকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গন্ধর্বপুর প্রকল্পের প্রথম পর্যায় চালু হলে প্রতিদিন ৫০ কোটি লিটার শোধিত পানি ঢাকার সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার কথা। ভবিষ্যৎ দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ৫০ কোটি লিটার সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

ফলে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু ঢাকার পানি সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানো নয়, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিয়ে রাজধানীর দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন