সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

ভারতের ১৮ সদস্যের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ঢাকায়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা

১৭ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও জোরদারের লক্ষ্যে ভারতের উচ্চপর্যায়ের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল আজ সোমবার দুই দিনের সফরে ঢাকায় আসছে। ভারতের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ১৮ সদস্যের এ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (CII) মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সফরে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বাণিজ্য বাধা দূর করা, শিল্পে যৌথ বিনিয়োগ, সরবরাহব্যবস্থা ও আঞ্চলিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।

CII-এর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি ২০০৮ সাল থেকে সংগঠনটির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন এবং ভারতীয় শিল্পখাতের নীতি ও ব্যবসায়িক বিষয় নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছেন।

থাকছেন ভারতের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা

১৮ সদস্যের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলে ভারতের বিভিন্ন খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা রয়েছেন।

প্রতিনিধিদলে রয়েছেন গোদরেজ ইন্ডাস্ট্রিজের গ্রুপ প্রেসিডেন্ট রাকেশ স্বামী, ভারত বায়োটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুচিত্রা কে এল্লা, দ্য ইনফ্রাভিশনের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা ট্রাস্টি বিনায়ক চ্যাটার্জি, অরবিন্দ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পরম শাহ, LMW Global-এর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা পি জে রাজেশ, মাহিন্দ্রা গ্রুপের আঞ্চলিক প্রধান রাজেশ গুপ্ত, গোদরেজ কনজ্যুমার প্রোডাক্টসের দক্ষিণ এশিয়া প্রধান কৃষ্ণা খাটোওয়ানি, ফোর্বস মার্শালের গ্রুপ হেড (ইন্টারন্যাশনাল অপারেশনস) দীপক শর্মা এবং অ্যাপোলো হসপিটালসের গ্রুপ হেড (ইন্টারন্যাশনাল অপারেশনস) এম এস গুরু প্রসাদ।

CII-এর নেতৃত্ব পর্যায়ের তথ্যেও সুচিত্রা কে এল্লাকে ২০২৫-২৬ মেয়াদে সংগঠনটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং Bharat Biotech-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে এবারের সফরে ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন, টেক্সটাইল, অবকাঠামো, অটোমোটিভ, ভোক্তা পণ্য ও প্রযুক্তিসহ একাধিক খাতে সম্ভাব্য ব্যবসায়িক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক

সফরকালে ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরসহ সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বর্তমানে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে এ দায়িত্ব পালন করছেন বলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী।

আগামীকাল মঙ্গলবার দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (FBCCI)-এর নেতাদের সঙ্গে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা অংশ নেবেন।

এ ছাড়া বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (BIDA) সঙ্গেও প্রতিনিধিদলের বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ বাড়ানো, যৌথ উদ্যোগ এবং ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

টানাপোড়েনের মধ্যেই ব্যবসায়ী সফর

দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা টানাপোড়েনের মধ্যেই ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের এ সফর হচ্ছে।

বিশেষ করে ২০২৫ সালে ভারত বাংলাদেশি পণ্যের ওপর কয়েকটি বন্দর ও স্থলবন্দর-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপ করে। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন DGFT-এর ১৭ মে ২০২৫-এর নির্দেশনায় বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া তৈরি পোশাকসহ কয়েকটি পণ্যের প্রবেশপথ সীমিত করা হয়। তবে মাছ, LPG, ভোজ্যতেল ও crushed stone-এর মতো কিছু পণ্যে ওই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হয়নি।

এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত বাংলাদেশি পণ্য তৃতীয় দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে দেশটির স্থলসীমান্ত ব্যবহার করে transshipment সুবিধা প্রত্যাহার করে। ভারতীয় পক্ষ তখন তাদের বন্দর ও বিমানবন্দরে congestion, logistical delays এবং বাড়তি ব্যয়ের কথা কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

ফলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়ীরা বন্দর, লজিস্টিকস, কাস্টমস ও নন-ট্যারিফ বাধা নিয়েও আলোচনায় বসতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।

বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। তবে এ বাণিজ্যে বাংলাদেশের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারত বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুই দেশের বাণিজ্যে ভারসাম্য ভারতের পক্ষে উল্লেখযোগ্যভাবে ঝুঁকে আছে।

বাংলাদেশের জন্য তাই এবারের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ বাড়ানো।

কোন খাতে সম্ভাবনা বেশি

দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের পরিধি বাড়াতে বেশ কয়েকটি খাতকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা
  • কৃষি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্প
  • তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল
  • তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা
  • অবকাঠামো ও নির্মাণ
  • অটোমোবাইল ও যন্ত্রাংশ
  • বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
  • লজিস্টিকস ও সরবরাহব্যবস্থা
  • ভোক্তা পণ্য
  • যৌথ উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্প

এর আগে CII-এর নেতৃত্বে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে কৃষি, IT ও logistics খাতে যৌথভাবে কাজ করার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন এবং নন-ট্যারিফ বাধা কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছিল।

বিনিয়োগের নতুন সুযোগ খুঁজবে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা

বাংলাদেশের বাজারে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের ভোক্তা চাহিদা, দ্রুত নগরায়ণ এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারের সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনা ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে বাংলাদেশে উৎপাদন করে তৃতীয় দেশের বাজারে রপ্তানি, যৌথ উদ্যোগ এবং স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর সংযোগ তৈরির সুযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য ভারতীয় বাজারে রপ্তানি বাড়ানো, ভারত থেকে কাঁচামাল ও প্রযুক্তি আমদানি এবং যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে আঞ্চলিক value chain গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পুরোনো বাণিজ্য সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা

দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে নানা জটিলতা থাকলেও ব্যবসায়ী মহলে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার গুরুত্ব রয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ভারত বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার এবং প্রতিবেশী দেশ হিসেবে দুই দেশের স্থল, নৌ ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও ব্যাপক।

CII-এর নিজস্ব নথিতেও বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার নজির রয়েছে। ২০২৪ সালে CII বাংলাদেশে একটি CEO-level delegation পাঠানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিল।

এবারের ১৮ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সফর তাই কেবল ব্যবসায়ী সফর হিসেবে নয়, বরং দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ককে নতুন করে সক্রিয় করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকবে—ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কীভাবে কমানো যায়।

শুধু ভারত থেকে আমদানি বাড়ানোর পরিবর্তে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো, নতুন পণ্যকে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করানো এবং ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে উৎপাদন ও যৌথ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হলে এ ঘাটতি ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব হতে পারে।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

নজর থাকবে বৈঠকের ফলাফলে

দুই দিনের সফরে ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের একাধিক বৈঠককে তাই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

বন্দর ও বাণিজ্য বাধা, বাংলাদেশি পণ্যের বাজারপ্রবেশ, বিনিয়োগের পরিবেশ, যৌথ শিল্প স্থাপন, আঞ্চলিক supply chain এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ—এসব বিষয়ে বাস্তবসম্মত অগ্রগতি হলে সফরটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও ব্যবসায়ী পর্যায়ে যোগাযোগের এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বাণিজ্য বাধা কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বাস্তবভিত্তিক করার পথ খুলে দেয় কি না—এখন সেদিকেই নজর ব্যবসায়ী মহলের।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন