বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

রাস্তা ও ফুটপাতে আবারও হকার বসানোর উদ্যোগে জনঅসন্তোষ

দখলমুক্ত অভিযানের প্রশংসার মধ্যেই ‘বৈধতা দেওয়ার’ অভিযোগে বিতর্ক

রাজধানীর রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নেওয়া অভিযানে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও, এখন আবার নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করে রাস্তার ওপর হকার বসানোর উদ্যোগকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক ও জনঅসন্তোষ। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, নাগরিক মতামত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় উঠে এসেছে—এ উদ্যোগ মূলত জনগণের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত রাস্তা ও ফুটপাতকে পুনরায় দখলমুখী ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে অবৈধ দোকান, ফুটপাত দখলকারী স্থাপনা ও হকার উচ্ছেদে অভিযান চালানো হয়। এতে দীর্ঘদিন পর অনেক এলাকায় পথচারীরা স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সুযোগ পান। নগর পরিকল্পনাবিদ, নাগরিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান। বিশেষ করে গুলিস্তান, নিউমার্কেট, মিরপুর, ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর ও বাড্ডা এলাকায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে সেই প্রশংসার আবহের মধ্যেই নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে রাস্তার অংশ চিহ্নিত করে হকার বসানোর পরিকল্পনা নিয়ে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, কিছু এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে হকার বসানোর চিন্তাভাবনা চলছে। এ নিয়ে নাগরিকদের বড় একটি অংশ প্রশ্ন তুলছেন—যে রাস্তা ও ফুটপাত জনগণের চলাচলের জন্য নির্মিত, সেখানে কীভাবে পুনরায় বাণিজ্যিক ব্যবহারকে অনুমোদন দেওয়া হয়?

সমালোচকদের অভিযোগ, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবে রাস্তা দখলকে “প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা” দেওয়ার শামিল। তাদের মতে, ফুটপাত কোনো বাজার নয়; এটি পথচারীদের জন্য সংরক্ষিত স্থান। রাস্তার ওপর হকার বসানো হলে যানজট বাড়বে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং পথচারীরা আবারও সড়কে নেমে চলাচল করতে বাধ্য হবেন। এতে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হবেন।

বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনও বলছে, হকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে একটি অনিয়ন্ত্রিত চাঁদাবাজি চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনার আড়ালে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়। ফলে নতুন করে নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে হকার বসানোর ব্যবস্থা করলে সেই চক্র আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবিকার প্রয়োজনকে অস্বীকার করা যায় না, তবে তার সমাধান কখনোই প্রধান সড়ক ও ফুটপাত দখল হতে পারে না। তারা পরিকল্পিত হকার মার্কেট, স্বল্পমূল্যের বাণিজ্যিক জোন বা বিকল্প পুনর্বাসন ব্যবস্থার কথা বলছেন। তাদের ভাষ্য, বিশ্বের উন্নত শহরগুলোতে পথচারীর অধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, আর বাংলাদেশে উল্টো ফুটপাতকেই বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় পরিণত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। অনেকেই লিখছেন, নাগরিকদের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত রাস্তা ও ফুটপাতের প্রধান উদ্দেশ্য হলো নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা, কোনোভাবেই স্থায়ী বা অস্থায়ী বাণিজ্যিক দখল নয়। কেউ কেউ এটিকে “নগর ব্যবস্থাপনার আত্মবিরোধিতা” বলেও মন্তব্য করেছেন—একদিকে উচ্ছেদ অভিযান, অন্যদিকে পুনরায় বসার সুযোগ সৃষ্টি।

নাগরিকদের প্রত্যাশা, সিটি করপোরেশন জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে স্থায়ী ও কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে। রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, পথচারীবান্ধব নগর গড়ে তোলা এবং চাঁদাবাজিমুক্ত সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন নগরবাসীর প্রধান দাবি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন