বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪ বছর পর বন্ধ হচ্ছে গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প

চালু হয়নি বিশেষ বাস, বেড়েছে যানজট ও ভোগান্তি; আলাদা লেন ও স্টেশন সরিয়ে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত

টানা ১৪ বছর নির্মাণকাজ চলেছে। ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অথচ যে বিশেষ বাস চালুর লক্ষ্যে গাজীপুরের বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, সেই বাস আর চালু হয়নি। উল্টো বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকায় যানজট ও মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বন্ধ করে এর বিদ্যমান অবকাঠামো সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

গত রোববার (১৮ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (বিআরটি, গাজীপুর-এয়ারপোর্ট)’-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন সোমবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জারি করা এক চিঠিতে মন্ত্রিসভার আলোচনা ও সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জানানো হয়।

সরানো হবে স্টেশন ও আলাদা লেনের বিভাজক

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিআরটি করিডরের স্টেশন, আলাদা লেনের বিভাজকসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো অপসারণ করে পুরো করিডরকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে। পাশাপাশি প্রকল্পের দুটি দুই লেনের ওভারপাস চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যমান আইনি জটিলতা নিরসন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটি বন্ধ বা ‘প্রজেক্ট ক্লোজার’ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ‘ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি’ও বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংস্থাটির কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের আওতায় আনা হবে।

চারটি বিকল্প পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

মন্ত্রিসভার বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপস্থাপিত বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন বিকল্প পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে ‘বিকল্প-৪’ সবচেয়ে উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়েছে। এ বিকল্পে বিআরটির জন্য আলাদাভাবে নির্মিত অবকাঠামো সরিয়ে করিডরটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের প্রস্তাব ছিল।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে।

প্রতি মাসে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ

প্রকল্প বন্ধ ও অবকাঠামো রূপান্তরের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে বাস্তবায়নের অগ্রগতি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে জানাতে হবে।

এ নির্দেশনা ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট পিএলসিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দেওয়া হয়েছে।

দ্রুত যাতায়াতের লক্ষ্য, বাস্তবে বেড়েছে ভোগান্তি

বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত যাত্রীদের দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, মহাসড়কের নির্ধারিত আলাদা লেন দিয়ে বিশেষ বাস চলবে। এতে সাধারণ যানবাহনের সঙ্গে বিআরটি বাসের সংঘাত কমবে এবং যাত্রীরা কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন।

কিন্তু দীর্ঘ ১৪ বছর নির্মাণকাজ চলার পরও মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী বিশেষ বাস চালু করা সম্ভব হয়নি। এ সময়ে প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। দীর্ঘ নির্মাণকাজের কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে যাত্রী, চালক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

বিপুল ব্যয়ের পর পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে সরকার

বিআরটি প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল সড়কে আলাদা বাস করিডর তৈরি করে গণপরিবহনের গতি ও যাতায়াতের সক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু সেই ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় এখন আলাদা লেন ও স্টেশন সরিয়ে বিদ্যমান অবকাঠামো সাধারণ যানবাহন চলাচলের উপযোগী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত করিডরটি সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হবে। পাশাপাশি ওভারপাস দুটি চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে অবকাঠামো অপসারণ, ওভারপাস সম্প্রসারণ এবং প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করার কাজ কত দিনে শেষ হবে, তা এখনো নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন