২০২৭ সালের শেষ নাগাদ প্রতি সপ্তাহে একটি প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য; দেশে বছরে এক হাজারের বেশি রোগীর লিভার প্রতিস্থাপন প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা
লিভার প্রতিস্থাপন কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)। আগামী বছরের শেষ নাগাদ প্রতি মাসে চারটি লিভার প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি, যা বর্তমান হারের দ্বিগুণ।
বিএমইউর সংশ্লিষ্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফ উদ্দীন বাসসকে বলেন, লিভার প্রতিস্থাপন এখন নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে দুটি করে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। আগামী বছরের শেষ নাগাদ প্রতি মাসে চারটি, অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে একটি করে লিভার প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন সার্জারি বিভাগের নেতৃত্বে ১৯টি বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত একটি বহুবিভাগীয় দল এসব অস্ত্রোপচার পরিচালনা করে।
সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারে প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হতে পারে
বিএমইউর সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বিধান সি দাস জানান, লিভার সিরোসিসের শেষ পর্যায়, লিভার ক্যানসার এবং আকস্মিক লিভার বিকল হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর অবস্থায় লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। সফল প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে রোগীরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ পান।
দেশে ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মোট ১৩টি লিভার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে আটটি বিএমইউতে, তিনটি বারডেম হাসপাতালে এবং দুটি ল্যাবএইড হাসপাতালে করা হয়েছে।
২০১০ সালের ৩ জুন বারডেম হাসপাতালে দেশের প্রথম লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়। এরপর ২০১১ সালের ৬ আগস্ট ও ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সেখানে আরও দুটি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়। এ ছাড়া ২০১১ সালের জানুয়ারি ও মে মাসে ল্যাবএইড হাসপাতালে দুটি প্রতিস্থাপন করে বিএমইউর একটি বিশেষজ্ঞ দল।
বিএমইউ ২০১৯ সালে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অঙ্গ প্রতিস্থাপন কর্মসূচি শুরু করে। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি আটটি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন করেছে, যার মধ্যে ছয়টি হয়েছে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের নিয়মিত কর্মসূচির আওতায়।
সরকারি অর্থায়নে বিনামূল্যে প্রতিস্থাপন
বিএমইউর সর্বশেষ ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন সরকারি অর্থায়নে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়েছে। এসব অস্ত্রোপচারে ভারতের হায়দরাবাদের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি হাসপাতালের একটি বিশেষজ্ঞ দল কারিগরি সহায়তা দিয়েছে।
আগামী ৩০ ও ৩১ অক্টোবর বিএমইউতে আরও দুটি লিভার প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাগেরহাটের শরণখোলার দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইসমাত ইতি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হন। পরে ৪ জুলাই বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে বিনামূল্যে তাঁর লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়। এ ক্ষেত্রে তাঁর বড় বোন আয়েশা সিদ্দিকা নিজের লিভারের একটি অংশ দান করেন।
বাসসের সঙ্গে আলাপকালে স্নাতক ডিগ্রিধারী আয়েশা জানান, তাঁরা দুজনই এখন সুস্থ আছেন। তিন মাস ধরে বিএমইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা নেওয়ার পর গত সোমবার তাঁরা বাড়ি ফিরে গেছেন।
একইভাবে নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকার ২৩ বছর বয়সী সুমাইয়া কবির তাঁর বাবা ৬২ বছর বয়সী হাজি কবির হোসেনকে লিভারের একটি অংশ দান করেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁর বাবার লিভার সিরোসিস শনাক্ত হয়েছিল। চলতি বছরের ৩ জুলাই বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন হয়।
সুমাইয়া জানান, তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন এবং তাঁর বাবাও ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছেন। তবে দুজনকেই নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসার মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
বিএমইউতে প্রতিস্থাপনের সাফল্যের হার ৯০ শতাংশ
বিএমইউর প্রতিস্থাপন কর্মসূচিতে সর্বশেষ ছয়জন গ্রহীতার মধ্যে পাঁচজন বেঁচে আছেন। একজন সংক্রমণের কারণে মারা গেছেন। এর আগের চারজন রোগীও অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে বেঁচে আছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়েছে।
ডা. সাইফ উদ্দীন বলেন, বিশ্বমানের বিশেষায়িত কেন্দ্রগুলোতে লিভার প্রতিস্থাপনের সাফল্যের হার সাধারণত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ। বিএমইউতে এ হার প্রায় ৯০ শতাংশ। এ সাফল্য কর্মসূচিটি সম্প্রসারণে উৎসাহ জোগাচ্ছে।
তবে প্রতিস্থাপনের পর রোগীদের আজীবন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হয়। প্রতিস্থাপিত অঙ্গ যাতে শরীর প্রত্যাখ্যান না করে, সে জন্য নিয়মিত বিশেষ ওষুধ সেবন জরুরি।
চিকিৎসকদের মতে, শুরুতে এসব ওষুধের পেছনে মাসে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। সংকটপূর্ণ সময় পার হলে তা কমে মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় নেমে আসতে পারে।
দেশে বছরে এক হাজারের বেশি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য উল্লেখ করে হেপাটোলজিস্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ লিভারজনিত রোগে ভুগছেন। এসব রোগে প্রতিবছর ২২ হাজার থেকে ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর এক হাজারের বেশি লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেশে সীমিত পরিসরে এ চিকিৎসার সুযোগ থাকায় অনেক রোগীকে বিদেশে যেতে হয়।
প্রতিবেশী কোনো দেশে লিভার প্রতিস্থাপনের প্যাকেজ খরচ ৪০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা হতে পারে। জটিলতার কারণে দীর্ঘ সময় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকতে হলে ব্যয় এক কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে এ খরচ এক থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে; পশ্চিমা দেশগুলোতে ব্যয় আরও বেশি।
এ অবস্থায় দেশে লিভার প্রতিস্থাপনের সুবিধা সম্প্রসারণ করা গেলে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
প্রতিস্থাপনের ব্যয় কমানোর প্রত্যাশা
অধ্যাপক বিধান সি দাস জানান, বিএমইউর প্রাথমিক কর্মসূচিতে ১০টি অস্ত্রোপচারের জন্য সরকারি তহবিল থেকে পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সে হিসাবে প্রতি অস্ত্রোপচারে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৫০ লাখ টাকা। তখন অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজও চলছিল।
কর্মসূচিটি নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে প্রকৃত ব্যয় আরও কমে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের হিসাবে, সরকারি ভর্তুকি থাকা সত্ত্বেও বিএমইউতে একটি লিভার প্রতিস্থাপনের ব্যয় শেষ পর্যন্ত ১০ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা হতে পারে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে করপোরেট রেট অনুযায়ী একই প্রক্রিয়ার খরচ প্রায় ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
জীবিত দাতার লিভার দিয়েই চলছে প্রতিস্থাপন
বিএমইউতে বর্তমানে জীবিত দাতার লিভারের একটি অংশ নিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশে মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে লিভার নিয়ে প্রতিস্থাপন এখনো শুরু হয়নি। তবে এ বিষয়ে সম্প্রতি একটি আইন পাস হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডা. সাইফ উদ্দীন।
বিদ্যমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী, উপযুক্ত গ্রহীতাকে নিকটাত্মীয়রা লিভারের একটি অংশ দান করতে পারেন। সাম্প্রতিক আইনি সংশোধনের আওতায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে ‘আবেগী দাতা’—অর্থাৎ আত্মীয় না হলেও গ্রহীতার সঙ্গে গভীর আবেগীয় সম্পর্ক রয়েছে এমন ব্যক্তিরাও লিভার দান করতে পারেন।
ডা. সাইফ বলেন, দাতা ও গ্রহীতার মধ্যকার সম্পর্ক সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হয়, যাতে কোনো আর্থিক লেনদেন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য না থাকে। দাতা নির্বাচনের আগে বিস্তারিত চিকিৎসা পরীক্ষা করা হয়। সুস্থ ব্যক্তির শরীর থেকে লিভারের অংশ নেওয়ার সময় তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সাধারণত ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী ব্যক্তিদের দাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সম্ভব হলে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের অগ্রাধিকার দেয় বিএমইউ। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের মতো গুরুতর ও অনিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকলে কাউকে দাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।
দাতা ও গ্রহীতার চিকিৎসায় দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতি
একটি লিভার প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচারে সাধারণত ছয় থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগে। দাতাকে এক থেকে তিন দিন আইসিইউতে থাকতে হতে পারে। শারীরিক অবস্থা ভালো থাকলে সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতে পারেন।
অন্যদিকে, গ্রহীতাকে সাধারণত প্রায় সাত দিন আইসিইউতে এবং দুই থেকে তিন সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হয়। জীবিত দাতার লিভারের প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত অংশ অপসারণ করা হতে পারে। অবশিষ্ট অংশ সময়ের সঙ্গে পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে লিভারের কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সক্ষম।
বিএমইউর সংশ্লিষ্ট বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তাদের কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত কোনো দাতার মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

