বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কিশোরদের মানসিক সংকট: স্মার্টফোন নয়, স্কুলের চাপই বড় কারণ?

হেইডটের বহুল আলোচিত তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ পিটার গ্রের; বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই নতুন বিতর্ক

• ২০১০-এর পর কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির কারণ নিয়ে গবেষকদের তীব্র মতভেদ
• পিটার গ্রের দাবি—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, স্কুলের চাপ ও স্বাধীনতা হারানো বড় কারণ
• বহু গবেষণায় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সময় ও মানসিক সমস্যার মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া যায়নি—গ্রে
• স্মার্টফোন থাকা কিছু কিশোর বাস্তব জীবনেও বন্ধুদের সঙ্গে বেশি সময় কাটায়—গবেষণার উদাহরণ
• হেইডটের তত্ত্বের প্রভাবে বিভিন্ন দেশে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কড়াকড়ি
• গ্রের সতর্কতা—নিষেধাজ্ঞা উল্টো শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ ও স্বাধীনতার সুযোগ কমাতে পারে

প্রযুক্তি ডেস্ক

কিশোর-কিশোরীদের উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও মানসিক সংকট বৃদ্ধির জন্য এতদিন স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বড় দায়ী হিসেবে সামনে আনা হলেও এবার সেই বহুল আলোচিত ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন মনোবিজ্ঞান গবেষক পিটার গ্রে। তাঁর দাবি, সমস্যার মূল উৎস প্রযুক্তি নয়; বরং শিশুদের স্বাধীনতা ও অবাধ খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়া এবং শিক্ষাব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান চাপ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

সামাজিক মনোবিজ্ঞানী জোনাথন হেইডট তাঁর বেস্টসেলার The Anxious Generation-এ যুক্তি দিয়েছেন, ২০১০ সালের পর কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য অবনতির সঙ্গে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর এই তত্ত্ব বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের নীতিগত বিতর্কেও প্রভাব ফেলে।

কিন্তু হেইডটের সাবেক সহকর্মী গ্রে তাঁর নতুন বই Restoring Childhood-এ সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এনেছেন। তাঁর মতে, কয়েক দশক ধরে শিশুদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ এবং বড়দের সরাসরি তত্ত্বাবধান ছাড়া খেলাধুলা কমতে থাকা তাদের মানসিক সুস্থতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

২০১০-এর দশকে কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের নতুন অবনতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর স্কুলব্যবস্থা, কমন কোরভিত্তিক শিক্ষানীতি এবং শিক্ষার্থীদের ফল ভালো করার ক্রমবর্ধমান চাপকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে দেখছেন গ্রে।

স্কুলের চাপই কি বড় সংকট?

গ্রের বক্তব্য, বিভিন্ন গবেষণায় শিশু-কিশোরদের উদ্বেগ ও মানসিক চাপের উৎস জানতে চাওয়া হলে স্কুল ও পড়াশোনার চাপ বারবার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

তিনি আরও দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কত সময় কাটানো হচ্ছে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া যায়—এমন সিদ্ধান্ত গবেষণাসাহিত্য থেকে সহজে টানা যায় না। কিছু গবেষণায় উল্টো ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে আগে থেকেই বিষণ্নতা বা উদ্বেগে থাকা কিশোররা মানসিক চাপ সামলাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বেশি ব্যবহার করতে পারে।

ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি মানসিক সমস্যার কারণ, নাকি মানসিক সমস্যায় থাকা কিশোররাই সেখানে বেশি সময় কাটাচ্ছে?

স্মার্টফোন মানেই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নয়

গ্রে ফ্লোরিডার একটি গবেষণার উদাহরণও সামনে এনেছেন। সেখানে ১১ থেকে ১৩ বছর বয়সীদের মধ্যে স্মার্টফোন থাকা শিশুদের বাস্তব জীবনেও বন্ধুদের সঙ্গে বেশি সময় কাটানোর সম্পর্ক পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এ কারণে শিশুদের কাছ থেকে স্মার্টফোন কেড়ে নেওয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি বন্ধ করাই তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো হবে—এমন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সতর্ক করছেন তিনি।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হেইডট ও গ্রে একমত। তাঁদের দুজনেরই ধারণা, বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশক থেকে শিশুদের স্বাধীনভাবে বাইরে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে বড়দের তত্ত্বাবধান ছাড়া খেলা এবং নিজেরা সমস্যা সমাধানের সুযোগ ক্রমেই কমেছে। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস ও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

হেইডটের তত্ত্ব নিয়েও প্রশ্ন

হেইডটের বক্তব্য ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও একাডেমিক মহলে তাঁর বিশ্লেষণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য গবেষক ক্যান্ডিস ওজার্সসহ কয়েকজন গবেষক প্রশ্ন তুলেছেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মানসিক সমস্যার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক পাওয়া গেলেও সেখান থেকে সরাসরি কারণ-ফলের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা কতটা যুক্তিসংগত।

অন্যদিকে হেইডট মনে করেন, প্রযুক্তির ক্ষতি নিয়ে সংশয় প্রকাশকারী গবেষকদের একটি অংশ বৃহত্তর গবেষণা-সাহিত্যের তুলনায় ভিন্ন অবস্থানে রয়েছেন। কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যের ঐতিহাসিক পরিবর্তন ব্যাখ্যায় তিনি প্রযুক্তির বাইরের কারণও বিবেচনায় নিয়েছেন।

নিষেধাজ্ঞাই কি সমাধান?

বিতর্কটি এখন আর গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অস্ট্রেলিয়ার পদক্ষেপের পর যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নেও অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যেও শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু ফিচার সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গ্রে অবশ্য স্কুলে ফোন ব্যবহারে বিধিনিষেধ কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্কদের পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট থেকে দূরে রাখতে বয়স যাচাইয়ের মতো কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থার বিরোধিতা করছেন না। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে তাঁর সংশয় রয়েছে।

তাঁর আশঙ্কা, শিশুদের সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বন্ধ করে দিলে তা উল্টো নতুন সমস্যার জন্ম দিতে পারে। নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে শিশু-কিশোরদের নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল ব্যবহার শেখানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—কিশোরদের মানসিক সংকটের আসল কারণ কী?

স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্কুলের চাপ, স্বাধীনতা হারানো নাকি এসবের সম্মিলিত প্রভাব—বৈজ্ঞানিক বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি। তবে নতুন এই বিতর্ক একটি বিষয় স্পষ্ট করছে: শুধু প্রযুক্তিকে দায়ী করে সমাধান খুঁজলে কিশোরদের মানসিক সংকটের অন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন