বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-চীন বৈঠকে নতুন ইস্যু ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালী ঘিরে কূটনৈতিক টানাপোড়েন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী সংকট। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে চীন ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলতে সহায়তা করুক। তবে বেইজিং এ ধরনের সহযোগিতার বিনিময়ে তাইওয়ান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে বড় ধরনের কূটনৈতিক ছাড় চাইতে পারে।

হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জ্বালানি রুট। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা এবং মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ এবং ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে হরমুজে অচলাবস্থা চীনের অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

চীনের কৌশলগত অবস্থান

বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন পর্যন্ত ইরান সংকটে সরাসরি চাপ প্রয়োগ থেকে বিরত থেকেছে। বরং বেইজিং নিজেকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে।

সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর চীন যুদ্ধবিরতি, কূটনৈতিক আলোচনা এবং হরমুজে “নিরাপদ ও স্বাভাবিক নৌ চলাচল” পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়।

চীনের অবস্থান মূলত বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও আলোচনাভিত্তিক সমাধানের পক্ষে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ প্রয়োগ কৌশলের সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা ইরানকে হরমুজ খুলতে রাজি করায়। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেন, চীন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হওয়ায় তাদের কূটনৈতিক ভূমিকা রাখা উচিত।

তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, ইরান পরিস্থিতি “সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে” রয়েছে এবং চীনের সহায়তা তার প্রয়োজন নেই।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘায়িত সংঘাত ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তাইওয়ান হতে পারে চীনের প্রধান দাবি

বিশ্লেষকদের মতে, চীন যদি ইরান সংকট নিরসনে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তবে এর বিনিময়ে তারা তাইওয়ান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ছাড় চাইতে পারে।

তাইওয়ান ইস্যু বর্তমানে বেইজিংয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়গুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে অস্ত্র সহায়তা দিয়ে আসছে। বর্তমানে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্রচুক্তি ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন চাইতে পারে যুক্তরাষ্ট্র যেন তাইওয়ানের স্বাধীনতাপন্থী অবস্থানকে নিরুৎসাহিত করে এবং নতুন অস্ত্রচুক্তি স্থগিত রাখে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের পটভূমি

গত এক দশকে বাণিজ্য যুদ্ধ, দক্ষিণ চীন সাগর, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা, কোভিড-১৯ এবং তাইওয়ান ইস্যুকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়।

প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের “কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী” হিসেবে ঘোষণা করে। পরে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনও একই নীতি অনুসরণ করে।

তবে ২০২৫ সালে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ট্রাম্প প্রশাসন এশিয়া-কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার চেয়ে পশ্চিম গোলার্ধে বেশি মনোযোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।

চীনের হিসাব-নিকাশ

বিশ্লেষকদের মতে, চীন একদিকে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে চায়, কারণ তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা এর সঙ্গে জড়িত। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরান যুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদে জড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিকভাবে দুর্বল হয়, তবে সেটিও বেইজিংয়ের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট সম্প্রতি প্রচ্ছদে নেপোলিয়নের একটি বিখ্যাত উক্তি ব্যবহার করে এই পরিস্থিতিকে তুলে ধরে—“শত্রু ভুল করলে তাকে থামিও না।”

কূটনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প-শি বৈঠকে ইরান ও হরমুজ ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি মূল আলোচ্য বিষয় হবে না। চীনের জন্য তাইওয়ান এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাণিজ্য, কৃষিপণ্য ও কৌশলগত প্রতিযোগিতাই বেশি অগ্রাধিকার পাবে।

তবে ইরান সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ এখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন