বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতি ৫.৭ বিলিয়ন ডলার, বিশ্বে শীর্ষে বাংলাদেশ

সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার প্রায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি। কোরবানির পশুর সংখ্যা, বাজারমূল্য, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাবের বিচারে বিশ্বে এই খাতে বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

বিশ্বের মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে প্রতি বছর ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক পশু কোরবানি করা হয়, যা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে অংশগ্রহণ, বাজারের আকার ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিস্তারে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে দেশে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া মিলিয়ে প্রায় সোয়া কোটির মতো পশু বাজারে তোলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে কাজ করছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, কোরবানি শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি দেশের অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, কোরবানিকেন্দ্রিক এই অর্থনীতি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ‘মেগা-অর্থনৈতিক’ কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। পশুপালন, পরিবহন, হাট ব্যবস্থাপনা, চামড়া প্রক্রিয়াকরণসহ পুরো ভ্যালু চেইনে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে শক্তিশালী অর্থপ্রবাহ তৈরি হয় এবং নিম্ন আয়ের মানুষও এর সুফল পায়।

আন্তর্জাতিক তুলনায় দেখা যায়, পাকিস্তানে বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ পশু কোরবানি হয়। ইন্দোনেশিয়ায় ২০২৫ সালে কোরবানি হয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ৫৬ হাজার পশু। অন্যদিকে সৌদি আরবে হজ মৌসুমে ১০ থেকে ১৫ লাখ পশু কোরবানি হয়, যা অনেকাংশেই আমদানিনির্ভর। তুরস্কে প্রায় ৩৮ লাখ এবং মিসরে প্রায় ১৩ লাখ পশু কোরবানি হয়েছে। এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বাজার আকার ও অংশগ্রহণ অনেক বড়।

দেশের বিভিন্ন জেলায় ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক পশু প্রস্তুত হয়েছে। সাতক্ষীরায় ১ লাখ ২০ হাজার, বগুড়ায় ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি, খুলনা বিভাগে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ, ময়মনসিংহে ২ লাখ ২৬ হাজার এবং রংপুরে ৩ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। অধিকাংশ জেলায় চাহিদার চেয়ে পশু বেশি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, ফলে কোরবানির জন্য এখন আর পশু আমদানির প্রয়োজন হয় না। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রামীণ উদ্যোক্তা ও খামারিদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক খামারি লোকসানের মুখে পড়ছেন। পশুখাদ্য ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে প্রাণিসম্পদ খাতকে কর্মসংস্থানের বড় উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বেকারত্ব কমবে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, নীতিগত সহায়তা, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও অবকাঠামো জোরদার করা গেলে কোরবানিকেন্দ্রিক এই অর্থনীতি ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বিস্তৃত হতে পারে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে আরও শক্তিশালী অবদান রাখতে সক্ষম হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন