শনিবার, ৯ মে ২০২৬

মাদকের বিস্তার ও কিশোর গ্যাং: উদ্বেগ বাড়ছে দেশজুড়ে

দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মাদকাসক্তি ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক সহজলভ্য হওয়ায় কিশোর ও তরুণদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সহিংস কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে নৃশংস হত্যাকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে এসব গ্যাং সদস্যরা।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মনোরোগ চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, মাদকাসক্তদের বড় অংশের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তাদের অধিকাংশই ইয়াবা ও গাঁজায় আসক্ত। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব গ্যাং সদস্যরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করছে এবং বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে অন্যতম কারণ মাদক। যাদের স্কুল-কলেজে থাকার কথা, তাদের একটি অংশ এখন মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নিয়মিত মাদক গ্রহণের ফলে তরুণদের আচরণ ক্রমেই নিষ্ঠুর ও সহিংস হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা আবেগ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে এবং খুনসহ ভয়াবহ অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ-এর নির্দেশনায় পুলিশ, র‍্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থা দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযান সত্ত্বেও অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। কারণ হিসেবে ‘বড়ভাই’ ও প্রভাবশালী চক্রের পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি উঠে এসেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. সরওয়ার বলেছেন, নিয়মিত অভিযানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অপরাধী গ্রেপ্তার হচ্ছে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবীব পলাশও বলেছেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্ত দিয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের প্রবেশ বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। তাদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়; রাজনৈতিক দল, সমাজ ও পরিবারকেও এগিয়ে আসতে হবে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল বলেন, তার কাছে চিকিৎসা নিতে আসা তরুণ মাদকাসক্তদের অনেকেই এলাকায় প্রভাবশালীদের হয়ে মাদক বিক্রি করতে গিয়ে আসক্ত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, নিয়মিত ইয়াবা সেবনে অনেক তরুণ আবেগহীন ও সহিংস হয়ে উঠছে, যা সমাজের জন্য বড় হুমকি। প্রায় একই মত দিয়েছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাহেনুল ইসলামও।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সমাজে যত বেশি মাদক সহজলভ্য হবে, তত বেশি বাড়বে অপরাধ ও সহিংসতা। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংকট মোকাবেলায় করণীয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তার নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা করতে হবে।

পরিবারভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি

অভিভাবকদের সন্তানদের আচরণগত পরিবর্তনের দিকে নজর রাখতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং কী ধরনের অনলাইন কার্যক্রমে যুক্ত—সেগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং ও সহশিক্ষা কার্যক্রম

স্কুল-কলেজে নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি, কাউন্সেলিং এবং খেলাধুলা-সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখতে পারলে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমবে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ

কিশোর গ্যাং ও মাদক ব্যবসার পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি, চাঁদাবাজ চক্র ও কথিত ‘বড়ভাইদের’ বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সীমান্তে কঠোর নজরদারি

মাদক পাচার ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয় জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক প্রবেশ বন্ধ না হলে ভেতরে অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

কমিউনিটি পুলিশিং ও সামাজিক প্রতিরোধ

প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের সমন্বয়ে প্রতিরোধ কমিটি গঠনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক কার্যক্রম দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পুনর্বাসন ও চিকিৎসা

মাদকাসক্ত কিশোরদের শুধু শাস্তি নয়, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আধুনিক পুনর্বাসন কেন্দ্র বাড়ানোরও সুপারিশ করা হয়েছে।

অনলাইন ও সাইবার নজরদারি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য সংগ্রহ ও সংঘবদ্ধ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাই সাইবার নজরদারি বাড়ানো এবং তরুণদের অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক ও কিশোর গ্যাং এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি সামাজিক, পারিবারিক ও জাতীয় নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন