শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬

কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বহাল, করের হার বাড়ল

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অ্যাপার্টমেন্ট ও ভবন নির্মাণের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে। সোমবার জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এ ঘোষণা দেন। তবে এ সুবিধা নিতে হলে আগের তুলনায় বেশি কর পরিশোধ করতে হবে।

নির্ধারিত হারে কর পরিশোধ করলেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধরে নেবে—আয়করদাতা তাঁর টাকার উৎস যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ, আলাদা করে আয় উৎসের তথ্য দিতে হবে না। এই কর হার এলাকাভেদে এবং ফ্ল্যাট বা ভবনের আয়তনের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঢাকার গুলশান, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল ও দিলকুশা এলাকায় ২,০০০ বর্গফুটের বেশি আয়তনের অ্যাপার্টমেন্ট বা ভবনের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গফুটে কর নির্ধারণ করা হয়েছে ২,০০০ টাকা। একই এলাকায় ২,০০০ বর্গফুটের কম আয়তনের জন্য প্রতি বর্গফুটে কর ১,৮০০ টাকা। ধানমণ্ডি, মহাখালী, লালমাটিয়া, উত্তরা, বসুন্ধরা, সেগুনবাগিচা, ওয়ারী, সিদ্ধেশ্বরী, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশী, আগ্রাবাদ ও নাসিরাবাদ এলাকায় বড় আয়তনের জন্য প্রতি বর্গফুটে ১,৮০০ টাকা এবং ছোট আয়তনের জন্য ১,৫০০ টাকা কর প্রস্তাব করা হয়েছে।

উল্লিখিত এলাকা ছাড়া অন্যান্য সিটি করপোরেশন এলাকায় ১,৫০০ বর্গফুটের বেশি ফ্ল্যাট বা ভবনের ক্ষেত্রে কর হবে প্রতি বর্গফুটে ৭০০ টাকা এবং ১,৫০০ বর্গফুট বা কম হলে ৬০০ টাকা। জেলা সদর পৌরসভায় বড় আয়তনের জন্য ৩০০ টাকা ও ছোট আয়তনের জন্য ২৫০ টাকা এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় বড় আয়তনের জন্য ১৫০ টাকা ও ছোট আয়তনের জন্য প্রতি বর্গফুটে ১০০ টাকা কর ধার্য করা হয়েছে।

এছাড়া, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও এলাকাভেদে প্রতি বর্গফুটে ৫০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত কর দেওয়ার শর্তে কালোটাকা সাদা করা যাবে। অর্থাৎ, শুধু ফ্ল্যাট বা রেডিমেড অ্যাপার্টমেন্ট নয়—নিজস্ব জমিতে ভবন নির্মাণ করেও অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ থাকছে।

তবে এই সুবিধা শর্তসাপেক্ষ। অর্থের উৎস যদি কোনো বৈধ উৎস না হয় বা সেটি কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রম থেকে অর্জিত হয়, তাহলে তা এ সুযোগের আওতায় বৈধ করা যাবে না বলে বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগেও বিভিন্ন সময় কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই সুযোগ বারবার দেওয়া হলেও গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার এসে এই সুবিধা বাতিল করেছিল। এবার সেই সুবিধাই নতুন করহারসহ আবার চালু করা হলো।

অর্থনীতিবিদদের বড় একটি অংশ বরাবরই কালোটাকা বৈধ করার এই প্রক্রিয়াকে নৈতিকভাবে দুর্বল, সৎ করদাতাদের প্রতি বৈষম্যমূলক এবং দুর্নীতিকে উৎসাহিতকারী বলে অভিহিত করে আসছেন। এনবিআরের তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা কালো অর্থ এই পদ্ধতিতে সাদা করা হয়েছে।

২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে প্রায় সব সরকারই অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ দিয়ে এসেছে। তবে ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এই সুবিধা দেয়নি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাচারকৃত টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ দিলেও কেউ সেই সুযোগ নেয়নি। অথচ পরের বছরেই আবার ঢালাওভাবে কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু রাজস্ব বাড়ানো নয়, বরং করব্যবস্থার ন্যায্যতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সরকারের অগ্রাধিকার। বারবার কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ দিলে সৎ করদাতাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয় এবং দেশের অর্থনৈতিক নীতির প্রতি আস্থার সংকট দেখা দেয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন