বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬

সুমি আকাশে ড্রোন-যুদ্ধের ঘূর্ণিপাকে ইউক্রেনীয় সৈন্যরা

“প্রতিদিন যেন গ্রাউন্ডহগ ডে”, ড্রোনের ছায়ায় বাঁচা-মরার লড়াই, পরিবার হারানোর বেদনা

ওরলা গেরিন, বিবিসি, সুমি, ইউক্রেন

রাত নেমেই ইউক্রেনের উত্তর-পূর্ব সুমি অঞ্চলে শুরু হয় এক অসম লড়াই। অন্ধকার বনভূমির প্রান্ত থেকে বেরিয়ে আসে একদল ইউক্রেনীয় সৈন্য, তাদের হাতে শতবর্ষ আগের ডিজাইনের মেশিনগান, আর প্রতিপক্ষ ইরান-নির্মিত আধুনিক ‘কামিকাজে’ ড্রোন।

এই মোবাইল ফায়ার ইউনিটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কোডনেম ‘জেগার’। তিনি বলেন, “এটা প্রতিদিনের সেই একই চিত্র। আমাদের কাছে এটা যেন গ্রাউন্ডহগ ডে।” (সূত্র: Orla Guerin, BBC, ৩ দিন আগে প্রকাশিত প্রতিবেদন)

প্রতি রাতেই আকাশে শেহেদ ড্রোনের হানা

রাশিয়ার মূল আক্রমণাত্মক অস্ত্র হয়ে উঠেছে এই শেহেদ ড্রোন। এগুলো ছোট, শব্দ কম করে, আর অনেক সময় মেঘের ওপর দিয়ে উড়ে আসে। সুমি অঞ্চলে অনেক ড্রোন রাজধানী কিয়েভের দিকে ছুটে যায়।

জেগারের স্ক্রিনে লাল বিন্দু জ্বলতে থাকে—প্রতিটি বিন্দুই একটি ড্রোন। কখনও কখনও এক রাতে একশ’র বেশি ড্রোন উড়তে দেখা যায় সুমি অঞ্চলের আকাশে। (সূত্র: BBC)

এক সন্ধ্যায় সুমি এবং পাশের চের্নিহিভ অঞ্চলের আকাশে অন্তত ৩০টি ড্রোন শনাক্ত হয়। সৈন্যরা গুলি চালালেও অনেক সময়ই সেগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় অন্ধকারে। “একটা ড্রোন ঢুকে গেলে মন খারাপ হয়,” বলেন জেগার। “কিন্তু আমাদের আবেগ দেখানোর সুযোগ নেই। একটার পেছনে আরেকটা চলে আসে। যদি নামাতে পারি ভালো, না পারলে পেছনে আরেক দল আছে।”

এই ইউনিটের সৈন্যদের অনেকেই সাধারণ পেশার মানুষ—কেউ কৃষক, কেউ গৃহনির্মাতা। কৃষক সদস্যটি মজা করে বলেন, “এখন মাঠে আরেক কাজ করি।” অন্যদিকে গৃহনির্মাতা কুরবান বলেন, “বছর পার হয়ে যাচ্ছে, অথচ এই যুদ্ধ কতদিন চলবে, কেউ জানে না।”

কিয়েভে ড্রোন হামলার আতঙ্ক

এই ড্রোনগুলোর অনেকের লক্ষ্য থাকে রাজধানী কিয়েভ। সম্প্রতি এক রাতে রাশিয়া প্রায় ৩০০টি ড্রোন ছুড়েছিল কিয়েভের দিকে। শহরের ছয়টি স্থানে হামলা হয়, যেখানে অন্তত ৩০ জন নিহত হন। (সূত্র: BBC, Ukrainian Air Force)

“আমার বোনের মাথা শরীর থেকে আলাদা হয়ে পড়েছিল”

ড্রোন হামলার আরও হৃদয়বিদারক দিক দেখা যায় সুমি শহরের শরণার্থী শিবিরে। সেখানে ৩৭ বছরের মার্গারিটা হুসাকোভার সঙ্গে কথা হয়।

গত ১৭ মে পরিবারের সঙ্গে বাসে উঠেছিলেন মার্গারিটা। হাসতে হাসতে রওনা হয়েছিলেন শহরে। কিন্তু রাশিয়ার ড্রোন হামলায় বাস ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। নিহত হন মার্গারিটার মা, কাকা এবং বোন।

মার্গারিটা বলেন, “চোখ খুলে দেখি, চারপাশে কিছু নেই। বোনের মাথা শরীর থেকে আলাদা হয়ে পড়ে আছে। মায়ের কপালে গুলি লেগেছিল। কাকা ছিটকে পড়ে ছিলেন, তার মস্তিষ্ক বেরিয়ে এসেছে।”

তিনি নিজেও মারাত্মক আহত হন। তার ডান হাত এখনো লোহার রডে বাঁধা। বলেন, “সন্তানদের নিয়ে হয়তো আরও দূরে পালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু কোথাও নিরাপদ মনে হয় না। আমি নিজে না বাঁচলেও চলবে, কিন্তু সন্তানদের বাঁচাতে হবে।” (সূত্র: BBC)

সঙ্গে সঙ্গেই আকাশে বেজে ওঠে এয়ার রেইড সাইরেন। আশেপাশের কেউই তেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। এক সাংবাদিক বলেন, “এখন আর সাইরেনে কেউ দৌড়ায় না, যদি না বোমার শব্দ খুব কাছে আসে।” (সূত্র: BBC)

“৩০ জনের মধ্যে বেঁচে আছি মাত্র চারজন”

যুদ্ধ শুধু প্রান্তরেই নয়, আঘাত করেছে ব্যক্তিগত জীবনেও। সুমি সীমান্তের অরণ্যে দেখা মেলে কিছু সৈন্যের, যারা নতুন করে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

এক সৈন্য, ডাকনাম ‘স্টুডেন্ট’, বলেন, “আমি মনে করি আগামী এক-দুই বছরে যুদ্ধ শেষ হবে না। আর যদি কোনো যুদ্ধবিরতিও হয়, চার-পাঁচ বছরের মধ্যে আবার শুরু হবে। পুতিনের মনোভাব সাম্রাজ্যবাদী।” (সূত্র: BBC)

স্টুডেন্ট তার পরিবারকে ইউক্রেনের বাইরে পাঠিয়েছিলেন ২০২২ সালের গোড়ায়। সেই থেকে দুই মেয়েকে আর দেখেননি। বিবাহও ভেঙে গেছে। তার কণ্ঠে যুদ্ধের গভীর বেদনা।

“আমরা ৩০ জন প্রতিবেশী মিলে ব্যাটালিয়নে যোগ দিয়েছিলাম,” বলেন তিনি। “আজ আমাদের মধ্যে বেঁচে আছি মাত্র চারজন।” (সূত্র: BBC)

এই সংবাদ প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়েছে Orla Guerin-এর বিবিসি প্রতিবেদন অবলম্বনে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন