রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশকে বাইপাস করে ‘সেভেন সিস্টার্স’ সংযোগে ভারতের নতুন মহাসড়ক প্রকল্প

বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের শীতলতার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো—যাদের একত্রে ‘সেভেন সিস্টার্স’ বলা হয়—তাদের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের বিকল্প সংযোগ প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের কৌশলগত উদ্যোগ নিয়েছে দিল্লি। এবার বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে মিয়ানমার হয়ে সমুদ্র ও সড়কপথে নতুন করিডর গড়ে তোলা হচ্ছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে।

ভারতের ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন লিমিটেড (NHIDCL)-এর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, মেঘালয়ের শিলং থেকে আসামের শিলচর পর্যন্ত ১৬৬.৮ কিমি দীর্ঘ চার লেনবিশিষ্ট মহাসড়ক নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এই সড়ক এনএইচ-৬ মহাসড়কের সম্প্রসারণ হিসেবে কাজ করবে এবং মূলত সেভেন সিস্টার্সে দ্রুত ও নিরাপদ পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের জন্য বিকল্প করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ইতোমধ্যেই মিয়ানমারে বাস্তবায়নাধীন কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট প্রজেক্ট ভারতের সমুদ্রবন্দরগুলোর (বিশেষ করে কলকাতা ও বিশাখাপত্তনম) সঙ্গে রাখাইনের সিত্তে বন্দর এবং সেখান থেকে মিজোরাম পর্যন্ত সড়কপথে সংযোগ স্থাপন করেছে। নতুন শিলং–শিলচর মহাসড়ক এই করিডরকে আরও বিস্তৃত করবে এবং জোরিনপুই থেকে লংলাই হয়ে আইজল পর্যন্ত পৌঁছে দেবে।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত সরাসরি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পাঠাতে পারবে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ বাইপাস করে। ভারতের এক কর্মকর্তা বলেন, “এটি শুধু উচ্চগতির করিডর নয়, বরং একটি কৌশলগত জবাব। বাংলাদেশ এখন আর নির্ভরযোগ্য প্রবেশদ্বার নয়।”

এই সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে হাইব্রিড অ্যানুইটি মোডে (HAM)—যা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (PPP) একটি ধরন। এতে থাকছে ১৯টি বড় সেতু, ১৫৩টি ছোট সেতু, ৩২৬টি কালভার্ট, ২২টি আন্ডারপাস, ২৬টি ওভারপাস এবং ৩৪টি ভায়াডাক্ট। জটিল ভূপ্রকৃতির কারণে প্রকল্পে রক অ্যাংকর, হাই-স্ট্রেন্থ ওয়্যার মেশ, ইনক্লাইনোমিটার, পাইজোমিটার, রেইন গেজ এবং জিওফোনের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে।

প্রকল্পটি চালু হলে শিলং থেকে শিলচরের যাত্রাপথ ৮ ঘণ্টা থেকে কমে প্রায় ৫ ঘণ্টায় নেমে আসবে। এতে সেভেন সিস্টার্সের সঙ্গে ভারতের মূল ভূখণ্ডের বাণিজ্যিক সংযোগ দ্রুততর হবে।

এদিকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে সংযোগ স্থাপনের ভারতীয় প্রকল্পগুলো বর্তমানে ঝুলে আছে। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত তিনটি নির্মাণাধীন প্রকল্প বন্ধ হয়েছে এবং পাঁচটির জরিপ থেমে গেছে। মোট ব্যয় আনুমানিক ৫,০০০ কোটি রুপির বেশি। সেইসঙ্গে ভারত এখন ভুটান ও নেপালের মাধ্যমে বিকল্প করিডর স্থাপনের চিন্তাও করছে। এসব নতুন পরিকল্পনার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে আরও সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি রুপি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দিল্লি-ঢাকার কূটনৈতিক উষ্ণতা কমে গেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সরকার বঙ্গোপসাগরপথে ভারতকে প্রবেশাধিকার সীমিত করার সিদ্ধান্তের পর ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’ নতুন করে পুনঃসংজ্ঞায়িত হচ্ছে।

তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এমন উত্তরণ সত্ত্বেও ২০২৪ সালে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা স্পষ্ট করে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ ভারতের এই প্রকল্পগুলোর পেছনে একটি বড় চালিকাশে রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন