শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গঠনমূলক পরিবর্তনের সূচনা: রিজার্ভ বাড়ছে, রাজস্ব কাঠামোতে বড় সংস্কার

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ২০২৫ সালে এসে দেখা দিয়েছে এক নতুন বাস্তবতা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনরুদ্ধার, কাঠামোগত রাজস্ব সংস্কার, এবং আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থার সহায়তায় একটি স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি তৈরির লক্ষ্যে এগোচ্ছে দেশটি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে একাধিক আর্থিক ও নীতিগত চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরপর্ব অতিক্রম করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের এপ্রিল শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২৭.৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যদিও আইএমএফ অনুমোদিত BPM6 পদ্ধতিতে হিসাব করলে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২.০৪ বিলিয়ন ডলার। এই রিজার্ভ পুনরুদ্ধারের অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রবাসী আয় এবং রপ্তানি খাতে ধীরে ধীরে গতি ফিরে আসা। মার্চ মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ পৌঁছেছে ৩.২৯ বিলিয়ন ডলারে, যা দেশের ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে রপ্তানি আয়ে ১২.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে বাংলাদেশ সরকার রাজস্ব কাঠামোয় যুগান্তকারী সংস্কার এনেছে। আইএমএফ-এর শর্ত অনুযায়ী বিলুপ্ত করা হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), এবং গঠন করা হয়েছে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ: রাজস্ব নীতি বিভাগ (Revenue Policy Division) ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ (Revenue Management Division)। এর ফলে করনীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের সম্ভাব্য আকার নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৭.৯ লক্ষ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪.৯৯ লক্ষ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭.৬ শতাংশ বেশি। সরকার উন্নয়ন ব্যয় কিছুটা কমিয়ে ২.৩ লক্ষ কোটি টাকায় নামিয়ে এনেছে, অন্যদিকে ঋণের সুদ পরিশোধে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১.৩৩ লক্ষ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৬.৮ শতাংশ।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এই সংস্কারের পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও শর্ত। আইএমএফ-এর সাথে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ আগামী জুন মাসে ১.৩ বিলিয়ন ডলার পাচ্ছে। এ ছাড়া, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB), জাপান ও OPEC ফান্ড থেকে অতিরিক্ত ২ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা আসবে বলে প্রত্যাশা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও ADB একযোগে বলছে—বাংলাদেশের জন্য এই সংস্কারসমূহ জরুরি, বিশেষ করে যখন দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৩ থেকে ৩.৯ শতাংশে নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৪ শতাংশ এবং সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৯.১৭ শতাংশে অবস্থান করছে। জ্বালানি, পরিবহন ও খাদ্যপণ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্যের কারণে সাধারণ জনগণ চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা ভাবছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের এই সকল গঠনমূলক পদক্ষেপ দেশকে মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে পারে—যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা যায়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন