রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

জুলাই সনদকে আইনি রূপ দিতে গণভোটের প্রস্তাব জামায়াতের

জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত ‘জুলাই সনদ’-কে আইনগত স্বীকৃতি দিতে গণভোটের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই সনদসহ জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো ইস্যুতে জনমতের প্রতিফলন ঘটাতে গণভোটই হতে পারে কার্যকর মাধ্যম।

বিজ্ঞাপন

রোববার সংসদ ভবনের এলডি হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বর্ধিত বৈঠকে অংশ নিয়ে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “গণভোট একটি জনগণনির্ভর পদ্ধতি। জনগণই সিদ্ধান্ত দেবে কোন বিষয়কে তারা বৈধতা দিতে চায়। আমরা চাই, জুলাই সনদ হোক কিংবা জাতীয় সনদ, সেটিকে জনগণের রায়েই চূড়ান্ত করা হোক।”

জাতীয় সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চলমান আলোচনায় জামায়াত বেশ কিছু কাঠামোগত প্রস্তাবও উত্থাপন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর দায়িত্ব পালনের সীমা নির্ধারণ, প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান হিসেবে একই ব্যক্তি দায়িত্বে না থাকা, বিতর্কিত নির্বাচনের দায়ে নির্বাচন কমিশনারদের অবসরের পরও শাস্তির বিধান রাখা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে একটি স্বতন্ত্র টাস্কফোর্স গঠন।

বিজ্ঞাপন

জামায়াতের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের শুধু চাকরিকালেই নয়, অবসরোত্তর সময়েও আইনের আওতায় আনা জরুরি। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের দাবি জানানো হয়েছে। ডা. তাহের বলেন, “অনেক নির্বাচন কমিশনার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।”

দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে আরও কার্যকর করতে জামায়াত দুদকের ওপর নজরদারির জন্য একটি পৃথক টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই টাস্কফোর্স কমিশনের সদস্যদের কার্যক্রম তদারকি করবে এবং কেউ দুর্নীতিতে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করবে।

ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার অংশ হিসেবে দলটি আরও প্রস্তাব দিয়েছে, যেন কোনো ব্যক্তি একযোগে দেশের সরকারপ্রধান এবং রাজনৈতিক দলের প্রধানের দায়িত্ব না পালন করেন। এটি রাজনৈতিক গঠনগত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে মনে করে জামায়াত।

জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠনের বিষয়েও নীতিগতভাবে একমত হয়েছে দলটি। তবে তারা এনসিসির গঠনতন্ত্রে প্রধান বিচারপতি ও রাষ্ট্রপতির অন্তর্ভুক্তির বিপক্ষে মত দিয়েছে। ডা. তাহেরের ব্যাখ্যা, “এই দুই পদকে নিরপেক্ষ রাখা দরকার যাতে সংকটকালীন সময়ে জনগণ তাদের প্রতি আস্থা রাখতে পারে এবং নির্ভর করতে পারে।”

বিজ্ঞাপন

আলোচনায় জামায়াত প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তার সঙ্গে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাসুম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আজাদ, এহসান মাহবুব যোবায়েরসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা।

ঐকমত্য কমিশনের পক্ষে আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. ইফতেখারুজ্জামান, সফর রাজ হোসেন ও মো. আইয়ুব মিয়া।

আলোচনার শুরুতে আলী রীয়াজ বলেন, “কমিশনের লক্ষ্য হলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ঐকমত্য গড়ে তুলে জাতীয় সনদ প্রণয়ন। এর জন্য প্রথম পর্যায়ের আলোচনা দ্রুত শেষ করে দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনায় অগ্রসর হওয়া হবে।”

জামায়াতের প্রস্তাবগুলো শুধু দলের রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং তারা ক্ষমতার ভারসাম্য, দুর্নীতিরোধ ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানাচ্ছে—এমন বার্তাও বহন করে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত। এখন অপেক্ষা, ঐকমত্য কমিশন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো এই প্রস্তাবগুলো কীভাবে গ্রহণ করে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন