বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রমজান: আত্মশুদ্ধি, সংযম ও সমাজ পরিবর্তনের এক মহাসুযোগ

পবিত্র রমজান মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এটি কেবল ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত না খেয়ে থাকার আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়া অর্জনের এক মহাসুযোগ। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, রোজা ফরজ করা হয়েছে যাতে মানুষ তাকওয়া অর্জন করতে পারে। অর্থাৎ রমজানের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের ভেতরের মানুষটিকে জাগ্রত করা—চরিত্র, আচরণ ও মননকে পরিশুদ্ধ করা।

রমজান আমাদের শেখায় সংযম। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট আমাদের উপলব্ধি করায় সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের বাস্তবতা। যখন আমরা ইফতারের টেবিলে বসি, তখন যেন মনে রাখি—আমাদের চারপাশে এমন মানুষ আছে যারা প্রতিদিনই এই কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন পার করে। তাই রমজান কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মাস নয়; এটি সামাজিক দায়বদ্ধতারও মাস। যাকাত, ফিতরা ও সদকার মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার এক অনন্য ব্যবস্থা ইসলামে নির্ধারিত হয়েছে। যদি আমরা যথাযথভাবে এই বিধানগুলো পালন করি, তবে সমাজে দারিদ্র্য অনেকাংশে লাঘব হতে পারে।

রমজান কুরআন নাজিলের মাস। এই মাসেই মানবজাতির হেদায়েতের জন্য আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। তাই এ মাসে কুরআন তিলাওয়াত, অনুধাবন ও আমলের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কেবল তিলাওয়াত করলেই হবে না; বরং কুরআনের শিক্ষা ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক জীবনে প্রতিফলিত করতে হবে। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারিতা ও পরস্পরের প্রতি সম্মান—এসব গুণাবলি কুরআনের শিক্ষারই অংশ।

রমজান আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়। বিগত দিনের ভুল-ত্রুটি, অন্যায় ও গুনাহ থেকে ফিরে এসে নতুনভাবে জীবন শুরু করার এক অনন্য সময় এটি। তারাবিহ, তাহাজ্জুদ, দোয়া ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করি। বিশেষ করে লাইলাতুল কদর—যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম—আমাদের জন্য অফুরন্ত কল্যাণের বার্তা নিয়ে আসে। এই রাতের ইবাদত ও দোয়া আমাদের জীবন পরিবর্তনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

তবে দুঃখজনকভাবে অনেক সময় আমরা রমজানের প্রকৃত চেতনা ভুলে গিয়ে বাহ্যিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকি। ইফতারকে কেন্দ্র করে অপচয়, বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ব্যবসায় অসততা—এসব আচরণ রমজানের শিক্ষা পরিপন্থী। রমজান আমাদের শেখায় ন্যায্যতা ও সততা। একজন ব্যবসায়ী যদি রোজা রেখে প্রতারণা করে, তবে সে রমজানের প্রকৃত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে পারেনি। একজন কর্মচারী যদি দায়িত্বে অবহেলা করে, তবে তার রোজার আধ্যাত্মিক সুফল ক্ষুণ্ণ হতে পারে। তাই রমজানের প্রভাব আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রমজান হতে পারে নৈতিক পুনর্জাগরণের এক সুবর্ণ সুযোগ। পরিবারে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি, প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া, মসজিদভিত্তিক শিক্ষামূলক আলোচনা, তরুণদের নৈতিক দীক্ষা—এসব উদ্যোগ সমাজকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নিতে পারে। রমজান যদি আমাদের কেবল এক মাসের জন্য পরিবর্তিত করে, তবে তা যথেষ্ট নয়; বরং এই পরিবর্তন যেন বছরের বাকি মাসগুলোতেও অব্যাহত থাকে।

অতএব, রমজান আমাদের সামনে যে সুযোগ এনে দেয়, তা সত্যিই অমূল্য। এটি আত্মশুদ্ধির, সমাজ সংস্কারের এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাস। আমরা যদি এই মাসের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারি, তবে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সব ক্ষেত্রেই এক ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।

আসুন, পবিত্র রমজানকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়; বরং জীবনের আমূল পরিবর্তনের এক মহাসুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের প্রকৃত চেতনা উপলব্ধি করে তা বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত করার তাওফিক দান করুন। আমিন। 


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন