বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিএনপির মাহেন্দ্রক্ষণ আজ, সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ নিচ্ছেন তারেক রহমান

প্রায় দুই দশক পর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির জন্য আজকে এক ঐতিহাসিক দিন হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে তাঁর ঘোষিত রাজনৈতিক অঙ্গীকার—‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান (আমার একটি পরিকল্পনা আছে)’—আজ আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে বলে দলীয় নেতারা মন্তব্য করেছেন।

দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে এবার শপথ অনুষ্ঠান বঙ্গভবনের পরিবর্তে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর নতুন সংসদ ও সরকার পেতে যাচ্ছে দেশ। সকাল ১০টায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। শপথবাক্য পাঠ করাবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সংসদীয় বৈঠকে নেতা নির্বাচন করা হবে এবং নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। বিকেল ৪টায় নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

শপথ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মন্ত্রিসভার শপথ পড়াবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, দেশি-বিদেশি প্রায় এক হাজারের বেশি অতিথি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে এবং ধোয়া-মোছাসহ সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

জিয়া পরিবারের নতুন অধ্যায়

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথের মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরেকটি অধ্যায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–এর পর এবার তাদের সন্তান তারেক রহমান দেশের নেতৃত্বে আসছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একই পরিবারের তিন সদস্যের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব গ্রহণ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসেও উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

মন্ত্রিসভা গঠন ও টেকনোক্র্যাট কোটা

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৬ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যদের প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেন। মন্ত্রিসভার একটি অংশ সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে এবং সীমিতসংখ্যক সদস্য সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে টেকনোক্র্যাট কোটায় নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, নতুন প্রজন্ম ও অভিজ্ঞ নেতাদের সমন্বয়ে ৩৫ থেকে ৪৫ সদস্যের একটি সংক্ষিপ্ত মন্ত্রিসভা গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক উপস্থিতি ও আঞ্চলিক বার্তা

শপথ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিদের উপস্থিতি এই আয়োজনকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল এবং মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু। এছাড়া নেপাল ও শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিদের উপস্থিতির সম্ভাবনার কথাও জানা গেছে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে এই অংশগ্রহণকে কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নিরাপত্তা ও আয়োজন

জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে এবং প্রবেশপথে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের সময় ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করে নতুন সংসদ সদস্যদের বরণে প্রস্তুত করা হয়েছে পুরো প্রাঙ্গণ।

নতুন যাত্রার সূচনা

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর আজকের শপথের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে নতুন সরকার। বিএনপি নেতারা বলছেন, “করব কাজ, গড়ব দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ” স্লোগানকে সামনে রেখে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সংস্কার ও আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি হবে সরকারের অগ্রাধিকার।

রাজনৈতিক অঙ্গনে আজকের দিনটিকে বিএনপির জন্য ‘মাহেন্দ্রক্ষণ’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। শপথের পর থেকেই শুরু হবে নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ যাত্রা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন