রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

লন্ডনে ১৫ মিলিয়ন পাউন্ডের ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ, অর্থ পাচারের সন্দেহ

মাত্র ১ পাউন্ডে কোম্পানি হস্তান্তরের মাধ্যমে মালিকানা আড়াল করার অভিযোগ; অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার আনিসুজ্জামান চৌধুরীর

লন্ডনে ১৫ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের হাইকোর্ট। দুর্নীতিবিরোধী তদন্তকারীদের অভিযোগ, অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে ফ্ল্যাটটি কেনা হয়েছে। ফ্ল্যাটটির প্রকৃত বাংলাদেশি সুবিধাভোগী মালিক আনিসুজ্জামান ‘রনি’ চৌধুরী নিজের নিয়ন্ত্রণ আড়াল করতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিটি মাত্র ১ পাউন্ডে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেছে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)।

লন্ডনের রিজেন্টস পার্কের কাছে অবস্থিত ফ্ল্যাটটি কেনার অর্থের বৈধ উৎস ব্যাখ্যা করতে না পারার পর চলতি সপ্তাহে সেটি বিক্রি বা হস্তান্তর ঠেকাতে আদালতের আদেশ পায় এনসিএ। সংস্থাটির দাবি, ফ্ল্যাটটির প্রকৃত মালিকানা গোপন করতে ‘ইচ্ছাকৃত অস্পষ্ট’ একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল।

আদালতে এনসিএর জমা দেওয়া সাক্ষ্য বিবৃতি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে ফিন্যানশিয়াল টাইমস (এফটি)।

বৃহস্পতিবারের শুনানিতে আদালতকে জানানো হয়, আনিসুজ্জামান চৌধুরীর ভাই সাইফুজ্জামান চৌধুরী বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী। গত বছর আনিসুজ্জামানের বিরুদ্ধে একটি উৎসবিহীন সম্পদের ব্যাখ্যা চেয়ে আদালতের আদেশ জারি হয়েছিল। ওই আদেশে তাঁকে প্রমাণ করতে বলা হয়, ফ্ল্যাটটি বৈধ অর্থে কেনা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের দুর্নীতিবিরোধী আইনে এ ধরনের আদেশের ক্ষেত্রে সম্পদের বৈধ উৎস প্রমাণে ব্যর্থ হলে সম্পত্তিটি অবৈধভাবে অর্জিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

জাল স্বাক্ষর ও মালিকানা আড়ালের অভিযোগ

আদালতে দেওয়া সাক্ষ্য বিবৃতিতে এনসিএর এক তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, সংস্থাটি সন্দেহ করছে, ফ্ল্যাটটি অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এবং মার্কিন সংগীতশিল্পী ক্রিস ব্রাউনের জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আনিসুজ্জামান ফ্ল্যাটটির মালিকানায় থাকা কোম্পানিটি নামমাত্র ১ পাউন্ডে তৃতীয় একটি পক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। তবে এর পেছনে এমন একটি জটিল আর্থিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, যাতে শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটটির ওপর নিয়ন্ত্রণ তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের হাতেই ফিরে আসে।

বিচারপতি কারেন স্টেইন রায়ে বলেন, সম্পত্তিটি অপরাধলব্ধ অর্থ দিয়ে কেনা হয়ে থাকতে পারে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যথেষ্ট যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। এ বিবেচনায় তিনি ফ্ল্যাটটি জব্দের আদেশ দেন। তবে বাড়ির মালিক হিসেবে দখল পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া চালানোর সুযোগ রেখে আদেশে একটি বিশেষ ছাড়ও রাখা হয়েছে।

আনিসুজ্জামানের আইনজীবীরা আদালতকে জানিয়েছেন, তাঁরা জব্দের আদেশের বিরোধিতা করছেন না।

অভিযোগ অস্বীকার আনিসুজ্জামানের

আনিসুজ্জামান এফটিকে বলেন, ‘আইনজীবীদের পরামর্শে আমি সম্পত্তি জব্দের আদেশের জন্য এনসিএর করা আবেদনের বিরোধিতা করিনি। তবে আমি কোনো ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত নই। এনসিএ যদি দেওয়ানি প্রক্রিয়ায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পদক্ষেপ নেয়, তবে আমি আইনিভাবে তার জোরালো মোকাবিলা করব এবং প্রমাণ করব যে আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা।’

সম্পত্তির মালিকানা গোপন করার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, এ বিষয়ে এনসিএর কাছে সব তথ্য ‘স্বচ্ছভাবেই প্রকাশ করা হয়েছে’। তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্ত্রী ও সন্তানদের এর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।’

জুলাইয়ে দেওয়া সাক্ষ্য বিবৃতিতে এনসিএর কর্মকর্তা জানান, আনিসুজ্জামান যুক্তরাজ্যেই অবস্থান করছিলেন এবং ওই অ্যাপার্টমেন্টটি তাঁর প্রধান বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করতেন।

১২.৪ মিলিয়ন পাউন্ডে কেনা হয়েছিল ফ্ল্যাট

যুক্তরাজ্যের ল্যান্ড রেজিস্ট্রির নথি অনুযায়ী, আনিসুজ্জামান ২০২৩ সালে তাঁর ‘রনি ৪২ লিমিটেড’ নামের কোম্পানির মাধ্যমে ১২ দশমিক ৪ মিলিয়ন পাউন্ডে রিজেন্টস পার্কের কাছের অ্যাপার্টমেন্টটি কেনেন।

পরে ফ্ল্যাটটির মালিকানায় থাকা কোম্পানিটি মাত্র ১ পাউন্ডে তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘পিএনএন ইউকে প্রপার্টিজ’।

আদালতে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে এনসিএর আইনজীবীরা এ হস্তান্তরকে সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংক থেকে অ্যাপার্টমেন্টটির বিপরীতে নেওয়া ঋণ পুনঃঅর্থায়নের ‘সুবিধাজনক সাজানো ব্যবস্থা ছাড়া আর কিছুই নয়’ বলে উল্লেখ করেন।

এনসিএর দাবি, কোম্পানির শেয়ারের জন্য মাত্র ১ পাউন্ড পরিশোধ করা হলেও শেয়ার বিক্রির প্রকৃত মোট মূল্য ছিল ১৪ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন পাউন্ড।

সংস্থাটি আরও জানায়, ডিবিএস ব্যাংকের ঋণ শেষ পর্যন্ত পুনঃঅর্থায়ন করা হয়নি। বরং ঋণ খেলাপি হওয়ার পর সিঙ্গাপুরের ব্যাংকটি এখন অ্যাপার্টমেন্টটির দখল বুঝে নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।

সাবেক ভূমিমন্ত্রী ও পরিবারের সম্পদ নিয়ে তদন্ত

বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ১৯৯২ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতন পর্যন্ত প্রায় ২৯৫ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ গড়ে তোলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশে থাকা এসব সম্পদের খোঁজ শুরু করে। সরকারের অভিযোগ ছিল, হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থে এসব সম্পত্তি কেনা হয়েছে।

চলমান দেওয়ানি তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের জুনে এনসিএ সাবেক ভূমিমন্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি জব্দ করে। একই মাসে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অবৈধ বা উৎসবিহীন সম্পদের ব্যাখ্যা চেয়ে আদালতের আদেশও পায় সংস্থাটি।

সাইফুজ্জামান চৌধুরী যুক্তরাজ্যের ব্রিজিং-লোন বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান মার্কেট ফিন্যানশিয়াল সলিউশনস থেকে শত শত বন্ধকি ঋণ নিয়েছিলেন। জালিয়াতির অভিযোগের মুখে প্রতিষ্ঠানটি এ বছর ধসে পড়ে।

আনিসুজ্জামান এর আগে এফটিকে বলেছিলেন, ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর ‘কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই’।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন