দুই মাসে খাতুনগঞ্জে কেজিতে বেড়েছে ১৭–২১ টাকা; ব্যবসায়ীরা দায় দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক বাজারকে, নজরদারি বাড়ানোর দাবি ভোক্তা অধিকারকর্মীদের
আমদানি স্বাভাবিক থাকার পাশাপাশি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ছোলার আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও দেশের বাজারে পণ্যটির দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। এতে আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সাধারণত রমজান মাসে ছোলার চাহিদা অনেক বেড়ে যায়।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে গত দুই মাসে প্রতি কেজি ছোলার দাম ১৭ থেকে ২১ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, অস্ট্রেলিয়ায় উৎপাদন কমার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং দর বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের বাজারেও।
তবে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও সংকটের কথা বলে দাম বাড়ানোকে রমজানের আগেই অগ্রিম মূল্যবৃদ্ধির কৌশল হিসেবে দেখছেন ভোক্তারা। ভোক্তা অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, বাজারে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা রোজার আগেই ধাপে ধাপে দাম বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
খাতুনগঞ্জে মণপ্রতি ছোলা ৩ হাজার ৭৫০ টাকা
সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৭৫০ টাকায়। অন্যদিকে, গত সপ্তাহে ঢাকার খিলগাঁও কাঁচাবাজারে প্রতি কেজি ছোলা ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
খাতুনগঞ্জের ছোলা ব্যবসায়ী ও ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিতোষ দে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, গত দুই মাসে অস্ট্রেলিয়া থেকে ছোলা আমদানির বুকিং দর ক্রমাগত বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘একপর্যায়ে অস্ট্রেলিয়ার ছোলার বুকিং দর টনপ্রতি ৮৫০ ডলারে উঠেছিল। বর্তমানে তা কিছুটা কমে ৮২০ থেকে ৮৩০ ডলারের মধ্যে রয়েছে। আগে টনপ্রতি ৬৫০ থেকে ৬৮০ ডলারে ছোলা বুকিং দেওয়া যেত।’
পরিতোষ দে আরও বলেন, কম দামের আগের চালানগুলো ছিল আগের বছরের। বর্তমানে বাজারে মূলত ওই পুরোনো ছোলা রয়েছে। নতুন মৌসুমের ছোলা বাজারে আসতে শুরু করলে দাম কমে আসতে পারে।
তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের প্রভাব দেশের বাজারে পড়লেও ভারত থেকে আমদানি বাড়ানো গেলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।
আমদানি বেড়েছে, চাহিদার হিসাব কী বলছে
চট্টগ্রাম উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ছোলা আমদানি হয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৫৫ মেট্রিক টন। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন।
২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্টে দেশে ছোলা আমদানি হয়েছে ১৭ হাজার ১৭৭ টন। ২০২৫ সালের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১ হাজার ৩৮১ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই দুই মাসে আমদানি বেড়েছে ১৫ হাজার ৭৯৬ টন।
এর আগে ২০২৬ সালের রমজানকে সামনে রেখে ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে দেশে ছোলা আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার ৭৯২ টন। এর মধ্যে শুধু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আমদানি হয় ৭৯ হাজার ৭৭১ মেট্রিক টন।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে ছোলার গড় চাহিদা ১০ থেকে ১২ হাজার টন। তবে রমজান মাসে এই চাহিদা বেড়ে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টনে পৌঁছায়। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ছোলার বার্ষিক চাহিদা ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার টন।
কৃত্রিম সংকট আছে কি না, যাচাইয়ের দাবি
ছোলার দাম বাড়ানোর পেছনে কৃত্রিম সংকট বা কোনো সিন্ডিকেটের ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে বাজারের মজুত, আমদানিকারকদের বিক্রির তথ্য এবং সরবরাহব্যবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন।
তিনি টিবিএসকে বলেন, ‘এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। মূলত বাজার তদারকির অভাবেই এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ছোলার চাহিদা কত, আমদানি কত হচ্ছে, আমদানি খরচ কত পড়ছে এবং কী দামে বিক্রি হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ থেকে বাজারকে মুক্ত করা কঠিন হবে।’
নাজের হোসাইনের আশঙ্কা, এভাবে দাম বাড়তে থাকলে রমজান পর্যন্ত তা আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অস্ট্রেলিয়ায় উৎপাদন কমার পূর্বাভাস
অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির কৃষি, পানি ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণা ও অর্থনীতি ব্যুরো ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ছোলার উৎপাদন ৫২ শতাংশ কমে ১০ লাখ টনের সামান্য বেশি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
ছোলা চাষের জমির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং দেশটির প্রধান উৎপাদন অঞ্চল নিউ সাউথ ওয়েলসের উত্তরাঞ্চল ও কুইন্সল্যান্ডে ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা থেকে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, উৎপাদন কমার পূর্বাভাসও অতিরিক্ত আশাবাদী হতে পারে। প্রকৃত উৎপাদন আরও কম হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা এবং ভারতের কিছু অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ার প্রভাবও ছোলার বাজারে পড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার কিছু অঞ্চলে ছোলার দাম টনপ্রতি প্রায় ১ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। বছরের শুরুর দিকে এই দাম ছিল প্রায় ৬০০ ডলার। তবে ফসল তোলার পর নতুন ছোলার সরবরাহ বাড়লে দাম কমে আসতে পারে।
সরবরাহে বড় সংকট নেই, বলছেন ব্যবসায়ী
চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন টিবিএসকে বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় ছোলার বুকিং দর বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। তবে বর্তমানে ছোলার সরবরাহে বড় ধরনের সংকট নেই।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. ফয়েজ উল্ল্যাহ বলেন, ছোলার মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি যাচাই করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

