পর্যটকদের গাড়িবহর সরিয়ে নেওয়ার পর সংঘর্ষ; সাজেক ভ্যালি বন্ধ ঘোষণা, এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের উজোবাজার এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে একটি সশস্ত্র দলের গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শুরু হওয়া গোলাগুলি দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আবদুর রকিব। এ ঘটনায় একজন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
সাজেক পর্যটন সড়কে অবরোধ দেওয়া বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেওয়ার পরপরই গোলাগুলি শুরু হয়। এর আগে প্রায় দুই হাজার পর্যটককে বহনকারী গাড়িবহরকে উজোবাজার এলাকা থেকে নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ করে দেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
পর্যটকদের গাড়িবহর সরানোর পর গোলাগুলি
সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাহারায় বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে পর্যটকেরা সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা হন। তবে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিক্ষোভকারীরা উজোবাজার এলাকা দখলে নেওয়ায় সেখানে আটকা পড়েন তাঁরা।
পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা লাঠিপেটা করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করেন। এরপর সকাল ১১টার দিকে পর্যটকদের গাড়িবহর ওই এলাকা ছেড়ে যায়। এর প্রায় ৩০ মিনিট পর গোলাগুলি শুরু হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আবদুর রকিব বলেন, ‘পর্যটকদের গাড়িগুলো এসকর্ট দিয়ে নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়। সেনাবাহিনীর সঙ্গে পুলিশ সদস্যরাও ছিলেন। পরে সশস্ত্র গোষ্ঠীরা পর্যটকদের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও গুলি ছোড়ে। বর্তমানে সেখানকার পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।’
হতাহতের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, ‘একজন সেনাসদস্য আঘাত পেয়ে আহত হয়েছেন বলে জানতে পেরেছি। তবে অবরোধকারীদের দিক থেকে কেউ আহত হয়েছে কি-না, তা জানা যায়নি।’
সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘ইউপিডিএফের সশস্ত্র সংগঠন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর গুলি চালায়। দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।’
গোলাগুলির খবর অস্বীকার ইউপিডিএফের
সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর গোলাগুলির ঘটনাকে ‘সর্বৈব মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলে দাবি করেছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)।
বৃহস্পতিবার দুপুরে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংগঠনটির মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে—এমন খবরের সত্যতা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া যায়নি।
বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, জেএসএসের সন্তু গ্রুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলমান শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ বানচাল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিজেরাই একতরফাভাবে বিভিন্ন দিকে গুলি ছুড়েছেন।
তবে পুলিশ ও সাজেক থানার ওসি গোলাগুলির ঘটনায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন।
অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা
সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন গতকাল বুধবার এক যৌথ বিবৃতিতে বৃহস্পতিবার থেকে পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দেয়। সংগঠন দুটি পর্যটকদের বুধবারের মধ্যেই সাজেক ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।
নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে সাজেক ভ্যালি বন্ধ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার মধ্যে সবাইকে নিরাপদে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাবুধন চাকমা ও নতুন জয় চাকমার সই করা যৌথ বিবৃতিতে সংগঠন দুটি জানায়, সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে গত ১১ অক্টোবর প্রথম অবরোধ শুরু করা হয়েছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাঘাইছড়ি জোনের উপ-অধিনায়ক সালমান ও প্রশাসন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের তিন দফা দাবি পূরণের আশ্বাস দিলে অবরোধ স্থগিত করা হয়। তবে কর্তৃপক্ষ দাবিগুলো পূরণ করেনি—এমন অভিযোগ তুলে ১৫ অক্টোবর আবার অবরোধ শুরু করে সংগঠন দুটি। পরে বাঘাইছড়ি ও মাচালং বাজারের দুর্গাপূজা উদ্যাপন কমিটির অনুরোধে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ স্থগিত রাখা হয়।
সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ
সর্বশেষ বিবৃতিতে সংগঠন দুটি অভিযোগ করে, জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যরা এখনো আগের অবস্থানগুলোতে রয়েছেন। কোম্পানি কমান্ডার চিনু মারমা ও সাইমন চাকমার নেতৃত্বে তাঁরা মাচালংয়ের থালকুম্ভো, চিল্যাতুলি কুঠি, নোয়াপাড়া, লম্বাবাক ও ভুয়াছড়ি এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন বলে দাবি করা হয়।
সংগঠন দুটির নেতাদের অভিযোগ, স্থানীয় শতাধিক বাসিন্দাকে হত্যার হুমকি দিয়ে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। গ্রামবাসীর মুঠোফোনও কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা। সশস্ত্র দলটির ভয়ে জুমচাষিরা তাঁদের হলুদ ও ঝাড়ুফুলের বাগানের পরিচর্যা করতে পারছেন না বলেও অভিযোগ করা হয়।
বিবৃতিতে সংগঠন দুটি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র দলটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ‘লোকদেখানো অভিযান’ পরিচালনার অভিযোগ তোলে। এ ছাড়া অভিযানের নামে সশস্ত্র দলটির কথিত নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের হয়রানি করা হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা এবং তাঁদের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় সশস্ত্র জেএসএস সদস্যদের এলাকা থেকে সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে বলে জানিয়েছে সংগঠন দুটি।
তবে অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি, জরুরি ওষুধ ও সংবাদপত্রবাহী যানবাহন এবং সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত সাংবাদিকদের গাড়ি।

