রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক ঈদুল আযহার অর্থনীতি

নাজমুল ইসলাম

বাংলাদেশের অর্থনীতি বিগত সরকারের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের কারণে চরম সংকটে পড়েছিল। সেই সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কার ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একদিকে যেমন মুদ্রাস্ফীতি কমেছে, অন্যদিকে রপ্তানি ও রিজার্ভেও উন্নতি এসেছে। তবে বিনিয়োগ স্থবিরতা ও বেকারত্বের উচ্চ হার এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

এই অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ঈদুল আযহার মতো বৃহৎ উৎসব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি একদিকে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, অন্যদিকে বৃহৎ অর্থনৈতিক গতিশীলতার মাধ্যম।

ঈদুল আযহার সময় কোরবানিকৃত পশু ও তার সম্পর্কিত কার্যক্রম অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণে আর্থিক প্রবাহ সৃষ্টি করে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রায় ৫৮ লক্ষ পশু কোরবানি হয়, যার বাজার মূল্য ছিল প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই সময়ে হাট ইজারা, ফড়িয়া, চাঁদা, টোল, পশু খাবার, খুঁটি-রশি, পরিবহন, কসাই, ও সাজসজ্জা—সব মিলিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ও লেনদেন তৈরি হয়।

ঈদে কোরবানিকৃত পশুর চামড়া দেশের চামড়া শিল্পের জন্য একটি মৌসুমী সম্পদে পরিণত হয়। এই সময় দেশের প্রায় সতেরো লাখ খামারের সঙ্গে যুক্ত কোটি মানুষের জীবিকায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। সরকারি ব্যাংকগুলো এ সময়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দেয়, যা ব্যাংক ও শিল্পখাত উভয়ের আয়ের উৎস হিসেবে কাজ করে।

ঈদকে কেন্দ্র করে পিয়াজ, রসুন, আদা, এলাচ, দারুচিনি, জিরা, লবঙ্গ, তেজপাতা ইত্যাদি মসলা জাতীয় পণ্যের চাহিদা বহুগুণে বেড়ে যায়। এসব পণ্যের বিপণনে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বাজার তৈরি হয়। একইভাবে গৃহস্থালির পণ্য, বিশেষ করে ফ্রিজের বিক্রি বেড়ে যায়। প্রতিবছর ঈদকে সামনে রেখে প্রায় ৩-৪ হাজার কোটি টাকার ফ্রিজ বিক্রি হয়।

ঈদের সময় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স নতুন রেকর্ড গড়ে। ২০২৪ সালের জুন মাসে ঈদের প্রভাবে ২.৫৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে, যেখানে আগের মাসে ছিল ২.২৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রতি মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী হয়েছে।

ঈদুল আযহা উপলক্ষে হজ পালনকারী মুসল্লিদের মাধ্যমে দেশীয় অর্থনীতিতে বড়সড় অর্থ প্রবাহ ঘটে। ২০২৪ সালে ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ হজে গিয়েছিলেন, যা থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ লেনদেন হয়। টিকিট, আবাসন, খাদ্য, পোশাক, ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক সেবা খাতগুলো সরাসরি লাভবান হয়।

সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঈদের সময় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার বোনাস বিতরণ হয়। এসব অর্থ জামাকাপড়, জুতা, প্রসাধনী, আতর, জায়নামাজসহ নানাবিধ ভোগ্যপণ্যে ব্যয় হয়, যা খুচরা বাজারে গতিশীলতা আনয়ন করে। একই সঙ্গে দানের মাধ্যমে অর্থনীতির নিচের স্তরে টাকা পৌঁছায়, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবাহ তৈরি করে।

ঈদে শহর থেকে গ্রামে মানুষের যাতায়াতের ফলে ট্রেন, বাস ও লঞ্চে ভিড় বাড়ে। পরিবহন খাতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বাড়তি লেনদেন হয়। পাশাপাশি টিকিটিং এজেন্সি, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, খাবার বিক্রেতা ও স্থানীয় যানবাহনের চালকরাও উপকৃত হন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির দুর্দশা থেকে উত্তরণে ঈদুল আযহার মতো উৎসব অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে নতুন মাত্রা দেয়। সরকার যদি এ সময়ের সম্ভাবনাগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে সামগ্রিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে এটি হবে একটি কার্যকর প্রাকৃতিক মডেল। উৎসবের অর্থনৈতিক প্রবাহ ও সামষ্টিক প্রভাব সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ ২.০ বিনির্মাণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন