শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠন: সংবিধান কী বলছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ৩০০ আসনের সংসদে ১৫০টির বেশি আসন পাওয়া মানেই এককভাবে সরকার গঠনের সাংবিধানিক সুযোগ তৈরি হওয়া। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ও ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

শপথ গ্রহণ: প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ

সংবিধান অনুযায়ী নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে। তবে বেসরকারি ফলাফল ঘোষণার পরপরই শপথ হয় না। সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হওয়ার পর তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ নিতে হয়।

অর্থাৎ, নির্বাচন কমিশন বেসরকারি ফল ঘোষণা করলেও সেটি চূড়ান্ত নয়। সরকারি গেজেট প্রকাশের পরই তিন দিনের সময়সীমা কার্যকর হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শপথ গ্রহণ ১৮ ফেব্রুয়ারির পর যাবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে তিনি বলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন করা হবে—সম্ভব হলে ১৫ বা ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই।

শপথ পড়াবেন কে?

সাধারণত জাতীয় সংসদের স্পিকার নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ করান। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সংসদ নেই, স্পিকারও দায়িত্বে নেই। ফলে শপথ পড়ানো নিয়ে সাংবিধানিক বিকল্প ব্যবস্থা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—রাষ্ট্রপতি শপথ পাঠ করানোর জন্য কাউকে মনোনীত করতে পারেন। যদি মনোনীত ব্যক্তি তিন দিনের মধ্যে শপথ পড়াতে ব্যর্থ হন, তাহলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পাঠ করাবেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য সরকার আগ্রহী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি—যেমন প্রধান বিচারপতি—শপথ পড়াতে পারেন। আর তা না হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার দায়িত্ব নেবেন। তবে এই ক্ষেত্রে তিন দিন অপেক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় আসে।

সরকার গঠন করবেন কে?

সংসদ সদস্যদের শপথ সম্পন্ন হওয়ার পর সরকার গঠনের সাংবিধানিক দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হবেন, রাষ্ট্রপতি তাঁকেই প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন।

অর্থাৎ, যে দল বা জোট ১৫১ বা তার বেশি আসনে জয়ী হয়েছে, সেই দলের সংসদীয় নেতা রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে সরকার গঠন করবেন। রাষ্ট্রপতি তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ ও নিয়োগ দেবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে মন্ত্রীসভা গঠিত হবে।

ক্ষমতা হস্তান্তর কখন সম্পন্ন হবে?

সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে—যে ক্ষেত্রে কার্যভার গ্রহণের পূর্বে শপথ আবশ্যক, সেখানে শপথ গ্রহণের অব্যবহিত পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বলে গণ্য হবেন। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের সাংবিধানিক ক্ষমতা কার্যকর হবে।

এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পূর্ববর্তী সরকারের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়ে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হবে।

সব মিলিয়ে, ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রকাশ, শপথ গ্রহণ এবং রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ—এই ধারাবাহিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকার গঠিত হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন